সেরিব্রাল পালসিকে তুচ্ছ করে ইংরেজিতে অনার্স, দেবস্মিতার আবৃত্তির তারিফ করবেন আপনিও

মানসিক দৃঢ়তা আর ইচ্ছেশক্তিই হল বড় কথা। এই দুইয়ের সমন্বয়ে জীবনের চড়াই-উতরাই, চলার পথের দুর্গমতাকে অনায়াসে জয় করে পৌঁছে যাওয়া যায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। কোনও প্রতিকূলতাই সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। যা করে দেখিয়েছেন দুর্গাপুরের দেবস্মিতা নাথ। সেরিব্রাল পালসিতে থেমে থাকেনি তাঁর জীবন। ইংরেজিতে অনার্স পড়ছেন। বাচিকশিল্পী হিসেবেও নজর কেড়েছেন। পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।

সেরিব্রাল পালসিকে তুচ্ছ করে ইংরেজিতে অনার্স,  দেবস্মিতার আবৃত্তির তারিফ করবেন আপনিও
মা-বাবার সঙ্গে দেবস্মিতা নাথ

।। প্রলয়কান্তি মোদক

দুর্গাপুর: জন্মের ছ’মাস পর হামাগুড়ি দেওয়া তো দূরের কথা, স্বাভাবিক ভাবে বসতেও পারতেন না। মেয়ের দৈহিক ভারসাম্যহীনতা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বাবা-মা। শুরু হল ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি। এই ডাক্তার নয়, সেই ডাক্তার। যে দিন প্রথম জানতে পারলেন মেয়ে দূরারোগ্য সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত সেই মুহূর্তে মাথায় যে আকাশ ভেঙে পড়েছিল। দুর্গাপুর বিধাননগরের উদভ্রান্ত নাথ দম্পতি সেদিন পাশে পেলেন না কাউকে। ভরসা না দিয়ে, মুখ ফিরিয়ে নিলেন স্বজন-পরিজনেরা। এই স্বজন-বিমুখতায় জেদ বাড়াল। নিজেদের মনের কাছেই পণ করলেন, হার মানবেন না। পরিবারে রেখে মেয়েকে কিছুটা হলেও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিলেন। শুরু হল এক লড়াই। যে লড়াইয়ের শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। আজ এতগুলো বছর পর নাথ দম্পতির সেই পরিশ্রম স্বার্থক। অন্যের কাছে নাথ দম্পতি আজ দৃষ্টান্ত। 

বাবা-মা'র উৎসাহে আর ইচ্ছাশক্তির জোরে মেয়ে দেবস্মিতা নাথও প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন। কঠিন রোগ নিয়েও জীবনের কোনও ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েননি। বরং আর পাঁচ জন সুস্থ ছেলেমেয়ের থেকেও নিজেকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। বর্তমানে ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়েছেন। সমান তালে চলছে গান-আঁকা-কবিতা। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড় নয়। যখন যা ভালো লাগে, তাই করেন। ছোট থেকেই আবৃত্তি ছিল নেশা, এখন পড়াশোনার পাশাপাশি সেটাই পেশা দেবস্মিতার। একাধিক খেতাব, সম্মান অর্জন করেছেন। আক্ষরিক অর্থেই জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে দুর্গাপুরের দেবস্মিতা নাথ এখন আইডল। 

পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর বিধাননগরের বাসিন্দা দেবস্মিতার বাবা দেবাশিস নাথ পেশায় ব্যাংককৰ্মী। মা সুমিতা নাথ হচ্ছেন সেই নেপথ্যের মানুষটি, ঘরের চার দেওয়ালে যাঁর সর্বক্ষণের লড়াই, ধৈর্য-স্নেহে দেবস্মিতা আজ জীবনের সব বাধাকে তুচ্ছ করে এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছেন।        

২০০১ সালের ১৬ এপ্রিলে আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই স্বাভাবিক ভাবে জন্ম হয় দেবস্মিতার। কিন্তু তাঁর বেড়ে ওঠা স্বাভাবিক ছিল না। ক্রমশ অসুস্থতা প্রকাশ্যে আসে। জানা যায়, তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত। সুমিতা ও দেবাশিসের কথায়, 'প্রথম দিকে মেয়ের অসুস্থতার কথা জেনে কেউই আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। তা সত্ত্বেও হার মেনে নিইনি আমরা। কারণ, সেই মুহূর্তে থেমে গেলে আমরা নিজেদের কাছেই হেরে যেতাম। ভবিষ্যতে কোন মুখ নিয়ে মেয়ের কাছে দাঁড়াতাম! তাই স্বামী-স্ত্রী মিলে দাঁতে দাঁত চেপে ওকে স্বাভাবিক জীবনে আনতে লড়াই শুরু করি। কোনও হোপে না রেখে বাড়িতেই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলেছি। এখনও চলছি। তাই দেবস্মিতা এখন অনেকটাই সুস্থ। শুধু হাঁটাচলার ক্ষেত্রে সামান্য একটি অসুবিধা রয়েছে।' জানালেন, প্রথম দিকে কিছু নার্ভের ওষুধ খেতে হলেও এখন মেয়ের একমাত্র চিকিৎসা যোগা।

কেমন ছিল দেবস্মিতার লড়াই? তাঁর মা-বাবা জানান, ছ’মাস বয়সেও চারদিকে বালিশ দিয়ে ওকে বসাতে হয়েছে। মুখ দিয়ে লালা ঝরত। তার পর এক চাইল্ড স্পেশালিস্ট বললেন, ওকে নিউরোর কোনও চিকিৎসক দেখাতে। কেউ কেউ বললেন, ওকে হোপে দেওয়া ভালো। শেষে আশার আলো দেখালেন ভেলোর  থেকে আসা একজন নিউরো সার্জেন। তিনি বললেন, পুরোপুরি না হলেও ওকে সময় দিলে, অনেকটা ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু কোনও অপারেশন করানো যাবে না। আর হোপে দেওয়া যাবে না। বাড়িতে রেখে ফিজিওথেরাপি করতে হবে। ওর সঙ্গে প্রচুর কথা বলতে হবে। গান, কবিতা শোনাতে হবে। চিকিৎসকের কথা মতোই আমরা এগোই।

তার পর ওকে লেখা ও আঁকা শেখানো হতো। প্রথম কথা বলল সাড়ে তিন বছর বয়সে। প্রথম 'বাবা', 'মামা', তার পর 'মা' বলেছিল। পিছনে ফিরে তাকাতে গিয়ে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল নাথ দম্পতির মুখ। 'তার পর ছোট ছোট শব্দ, কথা ও সবশেষে কবিতা। ঠিক এক বছরে ও হামা দিতে শুরু করল। আমাদের ভীষণ আনন্দ হয়েছিল। তিন বছর বয়সে ওকে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিলাম, যাতে বন্ধুদের দেখে কিছু শিখতে পারে।'

ALSO READ। পাল পাড়া বনাম মিত্র পাড়া

স্কুলে কাজি নজরুল ইসলামের কবিতা শুনে শুনে মুখস্ত করে ফেলেছিলেন দেবস্মিতা। আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে দ্বিতীয় পুরস্কারও পেল। বাচিক শিল্পে মেয়ের আগ্রহ দেখে আবৃত্তি শেখানোর ব্যবস্থা করলেন মা-বাবা। একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে গুণিজনের প্রশংসা অর্জন করেছেন। দুর্গাপুর, কলকাতায় একাধিক অনুষ্ঠান করেছেন। সম্মানিত হয়েছেন। বর্তমানে ইগনু থেকে ইংরেজিতে অনার্স করছেন। ভবিষ্যতে ইংরেজি নিয়ে উচ্চশিক্ষার পর শিক্ষকতা করতে চান দেবস্মিতা। পাশাপাশি একজন আবৃত্তিকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। 

ALSO READ। কোজাগরী লক্ষ্মী-আলপনা: সেকাল ও একাল

সুমিতা দেবীর দাবি, মেয়েক আজ এই জায়গায় নিয়ে আসা সহজ ছিল না। অনেক প্রতিবন্ধকতা পার করতে হয়েছে। কিন্তু ওকে আজ এই জায়গায় আনতে পারাটাই আমাদের সাফল্য। তাঁর একটাই আর্জি, সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুদের যেন হোপে না পাঠানো হয়। নিজের পারিবারে থেকে তারা যেন স্বাভাবিক জীবন পায়। মায়ের সুরে সুর মিলিয়ে দেবস্মিতা বললেন,'নিজে কঠিন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তাই ভবিষ্যতে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্তদের পাশে থেকে তাদেরও লড়াই শেখাতে চাই।'

ALSO READ। 'সর্দার উধম' অস্কার দৌড়ে যাওয়ার মতো ছবি