ফিনল্যান্ডের ডায়েরি ২: শান্ত বাল্টিক আর প্রতিবেশী অল্যান্ড

ফিনল্যান্ডের ডায়েরি: আমাদের এইবারের সফরের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুড়ে আছে। সঠিক সময়ে তাই বাকিটা বলব। আপাতত মারিয়াহাম শহরটা রোদে ভরে উঠেছে। সমুদ্রের ধারে হওয়ায় হাওয়া আছে কিন্তু ঠান্ডা কম। আমরা শীতের পোশাক আনিনি। তার জন্য পরে যে বেশ বিপদে পড়তে হবে, তা প্রথম দিন বুঝিনি।

ফিনল্যান্ডের ডায়েরি ২: শান্ত বাল্টিক আর প্রতিবেশী অল্যান্ড

কলকাতার কাছে শহরতলিতে বেড়ে ওঠা কৌশানী মিত্রের। তার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নিয়ে পড়াশোনা। সেই সূত্রেই যাদবপুরে বসবাস শুরু। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীবিদ্যা বিষয়ে এম ফিল এবং পাশাপাশি লেখালেখি, সাংবাদিকতা। বর্তমানে ফিনল্যান্ডের ইভাস্কুলা ইউনিভার্সিটিতে মাল্টিকালচারাল স্টাডিজে পাঠরত। প্যাশান ছবি তোলা, বেড়ানো।

দুই।।

এ অঞ্চলে বাস পাওয়া যাবে না, তাই শহর ঘুরতে হলে হয় ট্যাক্সি বা নিজের গাড়ি নয়তো সাইকেল কিংবা হাঁটা-- কোনও একটা রাস্তা নিতে হবে। ইউরোপে ট্যাক্সির খরচ অনেক বেশি তাই নিজের গাড়ি এ ক্ষেত্রে সবথেকে ভালো যানবাহন হতে পারে নতুবা সাইকেল।

।। কৌশানী মিত্র

অল্যান্ডের যে বিষয়টা আমাকে বেশ অবাক করেছিল তা হল, রাস্তার নিয়মকানুন। ইউরোপের প্রচলিত ব্যবস্থার থেকে আলাদা। সাধারণত ফিনল্যান্ডে গাড়ির রাস্তা আর সাইকেলের রাস্তা সমান্তরাল ভাবে পাশাপাশি থাকলেও দু'টিকে মিলেমিশে যেতে কোনও দিন দেখিনি। যে রাস্তায় গাড়ি বা বাস চলছে দ্রুতগতিতে সেখানে সাইকেল চালানো আইনত অপরাধ, সঙ্গে থাকে লাইফ রিস্ক। সরকার থেকে তাই দু'টি রাস্তাকে নিয়ম মেনে আলাদা রেখেছে। এখানে বিষয়টা অন্য। সাইকেল চালাও কিংবা হেঁটে যাও-- রাস্তা কিন্তু একটাই। সেখানেই তিরের গতিতে চলছে বাস বা গাড়ি। প্রথম দিন অবাক লেগেছিল, সাথে অবশ্যই ভয়, কারণ যে কোনও সময় দুর্ঘটনা বাঁধা। এসব প্রায় পার্বত্য অঞ্চলের রাস্তা দোলনার মতো, কখনও উঠে গেছে পরক্ষণেই নীচের দিকে নেমে গিয়ে প্রায় লেকের সঙ্গে মিলে গেছে। এই রাস্তায় দূর থেকে আসা গাড়ি দেখতে পাওয়া যায় না সবসময়। গাড়ি এসে সাইকেলের পাশ দিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেলে-- তবেই হুঁশ আসে। যেহেতু জায়গাটি এখনও ফিনল্যান্ড সরকারের আওতায় তাই শুনলাম পরের বছর থেকেই সমান্তরাল সাইকেলের রাস্তা তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।

আমরা যেখানে থাকছিলাম সেই ´ফাগলভিক ব্রেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট´ থেকে কিছুটা এগোলেই হাইওয়ে। আমাদের রোজ ১৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যেতে হত শহরে। তার পর সেখান থেকে এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া। মাঝে নাটোতে ৫ মিনিটের ব্রেক ছিল ধরা নিয়ম। আমার এমন লঙ সাইক্লিং-এর অভিজ্ঞতা প্রথম। রাস্তা হারিয়ে ফেললেও বিপদ। রাস্তায় একটা লোক নেই যাকে জিজ্ঞাসা করে ঠিক রাস্তায় যাব। তাই গুগল ম্যাপ সঙ্গী। তবে সোজা রাস্তায় মারপ্যাঁচ কম। বাঁক নেওয়ার সময় এলেই রাস্তার পাশে খুঁটিতে পোতা বোর্ড দেখতে পাওয়া যাবে। বাইরে থেকে কেউ এলে অসুবিধা একটাই-- সে বোর্ডে সবটাই হয় সুইডিশ নয় ফিনিশ ভাষায় লেখা। এসব ক্ষেত্রে আমার সঙ্গীটি আমার ওপর নির্ভরশীল। আমাদের এই ছোট্ট দু'জনের গ্রুপে একমাত্র আমি ফিনিশ পড়তে এবং বলতে পারি!

ALSO READ। ফিনল্যান্ডের ডায়েরি: শান্ত বাল্টিক আর প্রতিবেশী অল্যান্ড

এসব প্রায় পার্বত্য অঞ্চলের রাস্তা দোলনার মতো, কখনও উঠে গেছে পরক্ষণেই নীচের দিকে নেমে গিয়ে প্রায় লেকের সঙ্গে মিলে গেছে। এই রাস্তায় দূর থেকে আসা গাড়ি দেখতে পাওয়া যায় না সবসময়। গাড়ি এসে সাইকেলের পাশ দিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেলে-- তবেই হুঁশ আসে

আমাদের প্রথম দিনের প্ল্যান ছিল মারিয়াহামেন শহরটা ঘুরে দেখা এবং অবশ্যই শেষ পাতে বাল্টিক সাগরে স্নান। গরমকালে ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলোয় লেকের জলে স্নান করার এক আলাদা আনন্দ আছে। গরমকাল জুড়ে প্রায় প্রতিদিন স্নান করেছি আমাদের বাড়ির পাশে তুয়মিয়ার্ভি লেকে। কিন্তু সমুদ্রে স্নান করার মজা অন্য রকম। এ সমুদ্রে আমাদের বঙ্গোপসাগরের মতো ঢেউ নেই। তবে জলের রং কালো। আরবসাগরের মতো স্বচ্ছ নয়। হেলসিঙ্কি তুর্কু হয়ে এই বাল্টিক সাগরের বিস্তৃতি অনেকটা, সেই এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ইত্যাদি অনেকগুলো দেশে আঁচল ছড়িয়ে বসে আছে সে। এগুলোকে একডাকে বাল্টিক কান্ট্রিস বলা হয়। বহু আগে জলপথে বাল্টিক সাগরের ওপর দিয়েই চলত ব্যবসা। জাহাজ পৌঁছে যেত আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায়। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি এবং রাশিয়া এই দুই দেশের লোভ ছিল এই বাল্টিক কান্ট্রিসের দেশগুলিতে। ফিনল্যান্ড তার মধ্যে অন্যতম। আমাদের এইবারের সফরের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুড়ে আছে। সঠিক সময়ে তাই বাকিটা বলব। আপাতত মারিয়াহাম শহরটা রোদে ভরে উঠেছে। সমুদ্রের ধারে হওয়ায় হাওয়া আছে কিন্তু ঠান্ডা কম। আমরা শীতের পোশাক আনিনি। তার জন্য পরে যে বেশ বিপদে পড়তে হবে, তা প্রথম দিন বুঝিনি। মারিয়াহামেন শহরে বেশ কিছু মিউজিয়াম আছে। নাবিকজীবন এবং জাহাজ এই মিউজিয়ামগুলির বিশেষত্ব।

এ অঞ্চলে বাস পাওয়া যাবে না, তাই শহর ঘুরতে হলে হয় ট্যাক্সি বা নিজের গাড়ি নয়তো সাইকেল কিংবা হাঁটা-- কোনও একটা রাস্তা নিতে হবে। ইউরোপে ট্যাক্সির খরচ অনেক বেশি তাই নিজের গাড়ি এ ক্ষেত্রে সবথেকে ভালো যানবাহন হতে পারে নতুবা সাইকেল। হাঁটতে গেলে আরও দু-দিন বেশি সময় নিয়ে বেড়াতে যাওয়া ভালো। আমরা সাইকেলে প্রথমেই পৌঁছে গেলাম মেরিটাইম মিউজিয়াম। সুইডেন-ফিনল্যান্ড এবং অল্যান্ডের জাহাজের ইতিহাস জানার জন্য এ মিউজিয়াম কার্যকরী। মেরিটাইম মিউজিয়ামের প্রবেশপথে জানতে পারলাম পাশেই অবস্থিত পমার্ন শিপ মিউজিয়ামের কথা। টিকিট একইসঙ্গে কিনতে হবে। প্রথমটি হল সংরক্ষণশালা আর দ্বিতীয়টি প্রাচীন সংরক্ষিত জাহাজ। 

ALSO READ। ফিনল্যান্ডের ডায়েরি: শান্ত বাল্টিক আর প্রতিবেশী অল্যান্ড

সমুদ্রে স্নান করার মজা অন্য রকম। এ সমুদ্রে আমাদের বঙ্গোপসাগরের মতো ঢেউ নেই। তবে জলের রং কালো। আরবসাগরের মতো স্বচ্ছ নয়। হেলসিঙ্কি তুর্কু হয়ে এই বাল্টিক সাগরের বিস্তৃতি অনেকটা, সেই এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া ইত্যাদি অনেকগুলো দেশে আঁচল ছড়িয়ে বসে আছে সে। এগুলোকে একডাকে বাল্টিক কান্ট্রিস বলা হয়।

ফিনল্যান্ডে করোনাকালে আসার সবথেকে বড় অসুবিধা ছিল এই এক বছরে কোনও মিউজিয়াম ভ্রমণ হয়নি। ইউরোপিয়ান মিউজিয়াম নিয়ে ধারণা ছিল সীমিত। এখানে এসেই প্রথম যেটা লক্ষ করলাম, এরা মিউজিয়ামের প্রচলিত ধারণার অনেক বিস্তার ঘটিয়েছে। এখানে বাচ্চাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য আছে ক্যুইজ কন্টেস্ট। ওদের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে থাকছে নানান প্রশ্ন। উত্তর সঠিক দিতে পারলে পুরস্কার। আর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অবশ্যই মন দিয়ে দেখতে হবে মিউজিয়ামের সমস্ত অ্যান্টিক কালেকশান। অন্য দিকে, যুবক-যুবতীদের জন্য রয়েছে গেমিং জোন। সেখানে জাহাজ সংক্রান্ত নানান কম্পিউটার গেমস আছে, যা অবশ্যই নাবিক জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে সাহায্য করে। প্রাচীনকাল থেকে জাহাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির মধ্যে একটি ছিল পাল বাঁধা। তার জন্য দরকার নানান রকমভাবে দড়িতে গিঁট বাঁধতে পারার শিক্ষা। হাতেকলমে প্র্যাকটিস করার জন্য মিউজিয়ামের কোনায় সাজানো আছে বিশাল বড় পাল। 

মিউজিয়ামে গল্পের কোনও শেষ নেই। এক সময় মনে হচ্ছিল সত্যি যেন কোনও জাহাজের অন্দরমহলে আছি। প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানে কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম, গন্তব্য পমার্ন। সেখানে গিয়ে এক অন্যরকম অবাক হওয়ার পালা।  

(ক্রমশ)