ডেঙ্গি-ফাইলেরিয়াসিস ঠেকাতে তেচোখো মাছেই আস্থা গবেষকদের

মশা নিধনে গাপ্পি-গাম্বুসিয়া তো ছিলই। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে দেশীয় তেচোখো বা তেচোখা মাছের জুড়ি মেলা ভার।

ডেঙ্গি-ফাইলেরিয়াসিস ঠেকাতে তেচোখো মাছেই আস্থা গবেষকদের
রংবাহারি গাপ্পি

মশা নিধনে গাপ্পি-গাম্বুসিয়া তো ছিলই। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে দেশীয় তেচোখো বা তেচোখা মাছের জুড়ি মেলা ভার। মশক বিজ্ঞানী গৌতম চন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন শান্তনু সেনশর্মা

বছর ঘুরলেও করোনার প্রকোপ কাটেনি। বেশকিছু জায়গায় ডেঙ্গি (Dengue) নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। তার উপর আবার রয়েছে ফাইলেরিয়াসিসের (Filariasis) ভয়। এ হেন পরিস্থিতিতে মশা নিধনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলছেন গবেষকরা। আর এই নিধন কাজে গাপ্পি (Guppy)-গাম্বুসিয়া (Gambusia) মাছ চাষের পরিবর্তে একদম দেশীয় তেচোখো মাছ চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকরা। তাঁরা বলছেন, ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স ঠিকঠাক বজায় রাখতে গেলে গাপ্পি ছেড়ে তেচোখো মাছ চাষে গুরুত্ব দিতে হবে।

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক, মশক বিজ্ঞানী গৌতম চন্দ্র জানালেন, ডেঙ্গি প্রতিরোধে এডিস ও ফাইলেরিয়াসিস প্রতিরোধে কিউলেক্স মশার নিধনে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন জলাশয়ে গাপ্পি ও গাম্বুসিয়া মাছ ছাড়ার কাজ চলছে। কারণ, এগুলি খুব দ্রুত জলাশয়ে থাকা মশার লার্ভা ও পিউপা খেয়ে নেয়। 

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে তা হলে গাপ্পি-গাম্বুসিয়া ছেড়ে কেন আবার তেচোখো মাছ ছাড়ার কথা বলছেন গবেষকরা? গৌতমবাবু বললেন, 'জলাশয়ে গাপ্পি-গাম্বুসিয়ার বংশবৃদ্ধি অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এরা অন্য মাছের খাবার সব খেয়ে নেয়। ফলে অন্য মাছ আর বাড়তে পারে না। এতে জলাশয়ের ইকোলজিকাল ব্যালেন্স নষ্ট হয়। যা প্রকৃতির পক্ষে ক্ষতিকর। এদের এই ইনভেসিভ নেচারের জন্য তেচোখো দেশীয় মাছ চাষের পরামর্শ দিচ্ছি আমরা।'

তিনি জানান, তেচোখো মাছ (Indian Guppy fish) জলাশয়ে অন্য মাছের খাবার খেয়ে নেয় না। ফলে ইকোলজিক্যাল কোনও সমস্যা হয় না। অথচ তেচোখো,গাপ্পি ও গাম্বুসিয়ার মতোই দ্রুত মশার লার্ভা ও পিউপা খায়। ফলে মশক নিধনে এই মাছের ভূমিকা যথেষ্টই সদর্থক থাকে।

গত দেড় বছরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা হয়েছে বলে জানান গৌতমবাবু। তিনটি মাছের মধ্যে তুলনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, তেচোখো মাছ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ক্ষতিকর নয়। তাই মশা নিধনে এই মাছ যাতে আরও বেশি করে চাষ করা হয়, সরকারের কাছে সেই পরামর্শই তাঁরা দেবেন। 

পতঙ্গবিদ গৌতমবাবু নিউ টাউন-কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি ও নবদিগন্তের মুখ্য পরামর্শদাতাও। জানালেন, নিউ টাউনের জলাশয়গুলিতে এমনিই তেচোখা মাছ রয়েছে। যে জায়গাগুলিতে নেই, সেই পাঁচ ফুটের কম গভীর জলাশয়গুলিতে তেচোখা ছাড়া হয়েছে।

রাজ্যের অন্যত্রও সচেতনতার জন্যে চলছে প্রচার। গাপ্পি ও গাম্বুসিয়ার পরিবর্তে তেচোখো মাছ চাষের বিষয়ে প্রচার চালাচ্ছেন তাঁরা। প্রকৃতির সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই চলছে এই প্রচার। এ বিষয়ে আরও গবেষণামূলক কাজ চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে এই সংক্রান্ত আরও রিপোর্টও প্রকাশ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

ফাইলেরিয়া রোগ কী? কী ভাবে ছড়ায়?

ফাইলেরিয়া বা গোদ মশাবাহিত একটি রোগ। হাত ফোলা, পা ফোলা, হাইড্রোসিল এই রোগের ফলেই হয়ে থাকে। কিউলেক্স মশা রোগটির জীবাণুর বাহক। তবে ধারক মানুষই। তবে রোগের প্রকাশে মূল ভূমিকা থাকে এক প্রকার কৃমির। পূর্ণবয়স্ক কৃমি আক্রান্ত ব্যক্তির লসিকাগ্রন্থির মধ্যে বাস করে। স্ত্রী কৃমি বিপুল সংখ্যায় প্রজনন ঘটায়। অনু কৃমি বা মাইক্রো ফাইলেরিয়া রক্তের মধ্যে চলে আসে। তখনই রোগের প্রকাশ ঘটে। আক্রান্ত মানুষকে মশা কামড়ালে অনু কৃমি বা মাইক্রো ফাইলেরিয়া মশার শরীরে চলে আসে। পরে যখন ওই মশা অন্যকে কামড়ায়, তাঁর শরীরেও প্রবেশ করে মাইক্রো ফাইলেরিয়া। নিয়ম করে ওষুধ খেলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে বাস করা পূর্ণবয়স্ক কৃমিগুলি অনেক ক্ষেত্রেই মারা যায়। কিছু ক্ষেত্রে মারা না গেলেও দুর্বল হয়ে যায়। তখন কৃমি প্রজননের ক্ষমতা হারায়। ফলে সেই ব্যক্তির রোগ আর বাড়তে পারে না।

ALSO READ। সুন্দরবনের কুলতলিতে ম্যানগ্রোভ সাফ করে তৈরি হচ্ছে মেছোভেড়ি