লিঙ্গবৈষম্যের বাধা কাটিয়ে তালির বদলে ক্যামেরা বেছে নিয়েছিল যে হাত— জোয়া

১১ বছর বয়সে জোয়া বুঝতে পারে তিনি অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা। আর এই স্রেফ আলাদা হওয়ার মাশুল হিসেবে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। তার পর থেকে শহরের এক জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায়, বারবার জায়গা পালটে থাকতে হয়েছে যাতে কেউ তার আসল পরিচয় জানতে না পারে।

লিঙ্গবৈষম্যের বাধা কাটিয়ে তালির বদলে ক্যামেরা বেছে নিয়েছিল যে হাত—   জোয়া
জোয়া থমাস-- পরিযায়ী জীবন-যন্ত্রণার সাক্ষী তাঁর ক্যামেরা। ছবি: সংগৃহীত

যখন লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক স্টেশনে স্টেশনে হাহাকার করছে, ঘরে ফেরার জন্য, দেশ তাঁদের ঝেড়ে ফেলে দিল পিঁপড়ের মতো, সেই সময় জোয়া থমাস লোবো মুম্বইয়ের স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে বেড়াত ক্যামেরা নিয়ে। এই মানুষগুলোর জীবন-যন্ত্রণার সাক্ষী তাঁর ক্যামেরা। আলাপে সহজিয়া

মুম্বই: তিনি জোয়া থমাস লোবো। তিনি একজন ফোটোগ্রাফার। তিনি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। হ্যাঁ, আমাদের দেশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের একটাই পরিচয় হয়, সেটা তৃতীয় লিঙ্গ। কিন্তু জোয়া নিজের যোগ্যতায় তাঁর একটা অন্য পরিচয় তৈরি করেছেন, তিনি চিত্র সাংবাদিক। ভারতের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের চিত্র সাংবাদিক। তবে শুরুটা কিন্তু ততটাই কঠিন ছিল, যেমন এ ক্ষেত্রে সাধারণত হয়। সমাজে যাঁদের পরিচয় ‘হিজড়ে’ সে মানুষটা তালি দেওয়ার বদলে হাতে তুলে নিল ক্যামেরা। এক-একটা চলমান মুহূর্তকে শ্যাটার টিপে স্থির সময়ে আটকে দিল তাঁর পুরুষালি মোটা মোটা, নেলপালিশের রাঙিয়ে নেওয়া আঙুল। এক-একটা স্থির চিত্র গল্প বলতে শুরু করল দুর্বিষহ এক সময়ের, যখন লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক স্টেশনে স্টেশনে হাহাকার করছে, ঘরে ফেরার জন্য। দেশ তাঁদের ঝেড়ে ফেলে দিল পিঁপড়ের মতো। দেশবাসী ‘বিগ বস’-এর কৌতূহল নিয়ে দেখে চলল মানুষগুলোর যন্ত্রণা, অসহায়তা এমনকী মৃত্যুও। এই সময়ে জোয়া মুম্বইয়ের স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে বেড়াত ক্যামেরা নিয়ে। এই মানুষগুলোর জীবন-যন্ত্রণার সাক্ষী তাঁর ক্যামেরা। সেই ছবিগুলোই জোয়াকে স্বীকৃতি দিল ফোটোগ্রাফার হিসেবে। লিঙ্গভিত্তিক পরিচয়কে ছাপিয়ে গেল তাঁর কাজ। জোয়ার পরিচয় তিনি একজন ফোটোগ্রাফার। 

ট্রেননির্ভর জীবন হওয়াতে মুম্বইয়ের প্রতিটা স্টেশন হাতের তালুর মতো চেনেন জোয়া। তখন রোজই দেখতেন পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার তীব্র আকুতি। স্টেশন চত্বরে রোজ রোজ কত মানুষ ফেরার আশায় দূর দূর থেকে আসতেন।

শুরুটা সবার জানা। নিম্নবিত্ত যে কোনও ভারতীয়র শুরুটা অনেকটা একই রকম হয়। মুম্বইয়ের এক খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম। বাবা ছোটবেলাতেই মারা যান। মা নিজের দায়িত্বে দুই মেয়ের ভরণপোষণ করেন। ১১ বছর বয়সে জোয়া বুঝতে পারে তিনি অন্য ছেলেদের থেকে আলাদা। আর এই স্রেফ আলাদা হওয়ার মাশুল হিসেবে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। তার পর থেকে শহরের এক জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায়, বারবার জায়গা পালটে থাকতে হয়েছে যাতে কেউ তার আসল পরিচয় জানতে না পারে।

ভেঙে পড়া মানুষগুলোর যন্ত্রণা দেখতে দেখতে একদিন বাড়ি থেকে নিজের ক্যামেরাটা নিয়ে আসেন জোয়া। তার পর দৃশ্যবন্দি করতে থাকেন সেই অভূতপূর্ব অরাজকতাকে

১৭ বছর বয়সে আলাপ হয় গুরু সালমার সঙ্গে। যিনি তাঁকে নিজের সঙ্গে পরিচয় করান। জোয়া দীক্ষিত হয় হিজড়ে সমাজে। তার পর থেকে মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেনে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করেন। প্রথমে জোয়ার মা ভয় পেতেন জোয়ার এই জীবিকাকে। কিন্তু পরে তিনিও সেটা মেনে নিয়েছিলেন। ২০১৬-তে মা মারা যান। তার পর থেকে জীবন একই ছন্দে চলছিল, যতদিন না করোনার মহামারী শুরু হল। কিন্তু এর পর আসে পরিবর্তন। 

ইউটিউবে ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে ‘হিজড়া শাপ কি বর্ধন’ নামে একটি সিরিজ দেখে কমেন্টে কিছু মন্তব্য করেন জোয়া। তার পরে সিরিজের দ্বিতীয় পার্টে অভিনয় করার সুযোগ পান তিনি। জীবনে প্রথম বার অভিনয় করে পুরস্কারও পান। আর এই পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে তাঁর ভাষণ শুনে স্থানীয় একটি নিউজ এজেন্সি তাঁকে রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ করে।

হাতে প্রেস কার্ড পাওয়ার পরেও জোয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি, কী কাজ করতে হবে তাঁকে। ট্রেনে ভিক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই যে পারেন না! সেই সময় জোয়ার চোখ টানে ক্যামেরার জগত্‍‌। নিজের স্টোরিকে ভিন্ন আঙ্গিক দিতে জোয়ার কলমের সঙ্গী হয় ক্যামেরার লেন্স। ভিক্ষার জমানো ৩০ হাজার টাকা দিয়ে একটা পুরনো ক্যামেরা কেনেন তিনি। ২০১৯ সালে সেই ক্যামেরায় তিনি ট্রান্সজেন্ডারদের সমান অধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ-এর কভারেজ করেন। সেই সময় জোয়া থমাস নজরে পড়ে যান দিব্যকান্ত সোলাঙ্কি নামে একজন সিনিয়র চিত্র সাংবাদিকের। যিনি জোয়াকে নতুন পেশার অনেক কিছু শেখান। 

জোয়া চান, দেশে তৃতীয় লিঙ্গের বাচ্চাদের যেন শুধু লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের জন্য স্কুল থেকে তাড়িয়ে না দেওয়া হয়। পড়াশোনার অধিকার সবার আছে।

২০২০ সালে লকডাউন ঘোষণা হল সারা দেশে। ট্রেন নির্ভর জীবন হওয়াতে মুম্বইয়ের প্রতিটা স্টেশন হাতের তালুর মতো চেনেন জোয়া। তখন রোজই দেখতেন পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার তীব্র আকুতি। স্টেশন চত্বরে রোজ রোজ কত মানুষ ফেরার আশায় দূর দূর থেকে আসতেন। কিন্তু ট্রেন চলবে না বুঝে, বাড়ি ফেরা যাবে না বুঝে, তাঁদের কেউ সাহায্য করবে না বুঝে, ভেঙে পড়া মানুষগুলোর যন্ত্রণা দৃশ্যবন্দি করেন তিনি। তাঁর তোলা ছবিগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়। জোয়ার ছবি ছাপা হয় মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত পত্রপত্রিকাগুলোয়। তিনি পুরস্কারও পেয়েছেন তাঁর ছবির জন্য।

জোয়া শাড়ি পরেন নাকি জামা, মোটা করে কাজল দেন চোখে নাকি চোখে চশমা, গাঢ় রঙে রাঙা থাকে তাঁর ঠোঁট নাকি গোঁফ আছে নাকের নীচে এগুলো জোয়ার ছবিতে ধরা পড়ে না। ছবি কথা বলে থেমে থাকা মুহূর্তে, ফ্রেমে, নান্দনিকতায়। জোয়া জানিয়েছেন, যে দিদি একসময় তাঁর অন্য রকম পরিচয়ের জন্য অস্বস্তি বোধ করতেন, সেই দিদি এখন গর্ব করে তাঁর জন্য। অনেক কিছু পালটালেও কিছু জিনিস সব সময় একই থাকে। জোয়া চান, দেশে তৃতীয় লিঙ্গের বাচ্চাদের যেন শুধু লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের জন্য স্কুল থেকে তাড়িয়ে না দেওয়া হয়। পড়াশোনার অধিকার সবার আছে। জোয়া নিজে পড়াশোনা করতে পারেননি বলে তাঁর আক্ষেপ আজও আছে। তিনি চান লিঙ্গের পরিচয় নয়, মানুষের পরিচয়, মনুষত্বের পরিচয় অগ্রাধিকার পাক।

ছবি: সংগৃহীত