Tarun Majumdar-Hemanta: হেমন্তদা চলে যাওয়ার পর মুষড়ে পড়েছিলেন তরুণ মজুমদার

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের (Hemanta Mukherjee) তখন শরীর ভালো না। তরুণদাকে (Tarun Majumdar) বললেন, 'এই ছবির গান তো একটু লোক আঙ্গিক ঘেঁষা। আমাকে না দিয়ে আপনি শচীন কর্তাকে দিয়ে করান।' তরুণদা কোনও কথা শুনতেন না, ওনার এতটাই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের (Hemant Mukherjee) উপর আস্থা ছিল।

Tarun Majumdar-Hemanta: হেমন্তদা চলে যাওয়ার পর মুষড়ে পড়েছিলেন তরুণ মজুমদার

'পলাতক' ছবিতে উত্তম কুমার কাজ করতে চেয়েছিলেন। সে কথা উত্তম কুমার তরুণবাবুকে বলতেই তরুণবাবু বলেছিলেন, 'অনুপ কুমারকে ভেবেই আমার এই গল্পের  চিত্রনাট্য তৈরি করেছি। আপনাকে মানাবে না।'... তরুণ-তর্পণে  শিবাজী চট্টোপাধ্যায় (#ShibajiChatterjee)

পরিচালক তরুণ মজুমদারের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ 'ভালোবাসা ভালোবাসা' ছবির আগে, হেমন্তদার বাড়িতে (Tarun Majumdar-Hemanta)। হেমন্তদা আমায় ডেকেছিলেন, উনিও হেমন্তদার বাড়িতে এসেছিলেন। আমায় শুধু জিগ্যেস করলেন আপনি আগেও ছবিতে গেয়েছেন তো? এই একটি কথা। তার পরে উনি যাওয়ার পর হেমন্তদা বললেন, 'তুমি রেডি হও, তুমি এই ছবিতে গাইবে।'

এই প্রথম তরুণ মজুমদারের (Tarun Majumdar) সঙ্গে আমার আলাপ। তার পরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বেঁচে থাকতে তরুণ মজুমদারের যতগুলো ছবি হল, সবেতেই আমি গেয়েছি হেমন্তদার সুরে। 'পথ ভোলা', 'আগমন' এই সমস্ত ছবিতে হেমন্তদা মিউজিক করছেন, আমি গাইছি। এতে কী হল, আমায় দেখতে দেখতে তরুণদার আমার উপর কনফিডেন্স এসে গেল। কনফিডেন্স লেভেলটা এমন জায়গায় পৌঁছল, তখন তরুণদা বলতেন আপনি তো আমাদেরই ইউনিটের একজন। এ ভাবেই উনি আমাকে আপন করে নিলেন (Tarun Majumdar-Hemanta)।

সেই সময় আগমন' ছবিতে কে গাইবে গান সেটা ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না হেমন্তদা এবং তরুণদা।  আমার গান ছিল (Shibaji Chatterjee)। আগমন ৮৭-তে রিলিজ হল। ছবিতে গাওয়ার কথা ছিল শানু, মোহাম্মদ আজিজের। আজিজ এসে পৌঁছল না। তখন আমাকেই সব গাইতে হল। একটা গানের জায়গায় আমার অনেক গান গাওয়া হয়ে গেল। ওঁদের প্রত্যেকের কনফিডেন্স এমন ছিল যে, শিবাজী আছে সব হয়ে যাবে।

৮৯-তে হেমন্তদা চলে যাওয়ার পরে তরুণদার ছবিতে একটা গ্যাপ পড়ে গেল। এত বছরের দু'জনের সম্পর্ক, ২৫ বছর এক সঙ্গে কাজ করা। হঠাৎ করে হেমন্তদা চলে যাওয়ায় তরুণদা একটু মুষড়ে পড়েছিলেন। এই সময় তরুণদা বাধ্য হয়ে ভি বালসারাকে সুরকার করে 'পথ ও প্রাসাদ' বলে একটি ছবি করলেন। সেই সময় তরুণদা আমাকে এবং অরুন্ধতীকে বললেন আপনারা সঙ্গে থাকুন। ছবির কাজটা করি। বালসারাদাকে সুর করার দায়িত্ব দিলেন।

ALSO READ| Tarun Majumdar: তনুদা সিনেমার গল্পের সঙ্গে গানকে বুনে দিতেন

পরের ছবি করলেন 'সজনী গো সজনী'। এই ছবিতে পাঁচ জন সংগীত পরিচালক ছিলেন। অজয় দাস, মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ভি বালসারা, কানু ভট্টাচার্য এবং কুচিল মুখোপাধ্যায়। তখন তনুদা একটা সংশয়ে ভুগছেন। কী করলে ছবিতে সুরের জায়গাটা ঠিকঠাক হয়। 'সজনী গো সজনী'তেও একই ঘটনা, কুমার শানুর বেশকিছু গান গাইবার কথা ছিল। তখন  কাজ পড়ে যাওয়ায় শানু আসতে পারবে না বলল। আমার একটা বা দুটো গান গাওয়ার কথা ছিল বালসারাদার সুরে। যখন শানুকে পাওয়া গেল না, তখন অজয় দাস এবং মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে গানগুলো আমাকেই গাইতে হল। এই ছবিতে বাংলাদেশের সাবিনা ইয়াসমিনও গেয়েছিলেন।

তনুদা 'অভিমানে অনুরাগে' বলে একটি ছবির কাজ শুরু করেছিলেন। সেই ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন অজয় দাস। সেই ছবিতে একজন নতুন গায়ককে তরুণদা গাইতে নিয়েছিলেন।এই ছবিটাই সুমন চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া প্রথম ছবি হত। সেই সময় তরুণদা বললেন, 'শিবাজীবাবু আপনি একটু আসবেন রেকর্ডিং-এর সময় আমায় একটু হেল্প করবেন।' আমি গেলাম। আমি তখন সুমন চট্টোপাধ্যায়কে চিনি না। ওনার রেকর্ডিংয়ে  গানটা শুনে আমার বেশ ভালো লাগল। গানটা সুমনের নিজের সুরেই ছিল--  'এই শহর জানে আমার প্রথম সব কিছু'।  সেই সময় সুমনের সঙ্গে পরিচয় হল। উনি বললেন, 'আমি অনেক দিন বাইরে ছিলাম। আমি তরুণদাকে একটা ক্যাসেট দিয়ে গিয়েছিলাম। উনিই আমাকে পছন্দ করেছেন।' এ বার আমি গানটা দাঁড়িয়ে কন্ডাক্ট করলাম। সুমন গাইলেন। এর পরে আমার  ও অরুন্ধতীর রবীন্দ্রসংগীত ছিল। ছবির গান রেকর্ডিং হল। কিন্তু ছবিটা কমপ্লিট হল না। কিন্তু সুমন চট্টোপাধ্যায়ের তার পরেই এইচএমভি থেকে অ্যালবাম বেরোলো এবং সুপারহিট।

ALSO READ| Tarun Majumdar: যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে...

এর পরে তরুণদার পরিচালনায় লম্বা গ্যাপ ছিল। এই সময়ে তরুণদা দু'টি ধারাবাহিক করলেন একটি ছিল 'বন পলাশীর পদাবলী'। আমাকে একদিন ডাকলেন। তার স্ক্রিপ্ট শোনালেন। যেটা উত্তম কুমার করেছিলেন সেটা তো সিনেমা। উনি ধারাবাহিকের জন্য যে স্ক্রিপ্টটা করেছিলেন, সেটা এত ডিটেলে, আমি পড়ে অভিভূত হয়েছিলাম। সেই সময় তরুণদের সঙ্গে বসে সুর করা শুরু হল। এইচএমডি থেকে গানগুলো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাজেটের জন্য শেষ পর্যন্ত আর হয়নি।

সেই সময় ই টিভির জন্য তৈরি করেছিলেন ধারাবাহিক 'দুর্গেশনন্দিনী'। এই ধারাবাহিকে সুর করেছিলেন ভি বালসারা। অরুন্ধতী গেয়েছিলেন। আমার কোনও গান ছিল না। তবে, রেকর্ডিং-এ,  রিহার্সালে গিয়েছি। তখন কথায় কথায় বলেছিলাম, 'দাদা আমি একটা অ্যালবাম করেছি। 'পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন' গানটা একটা অন্য ট্রিটমেন্টে করেছি, আপনাকে শোনাব।' এটা বলার দু'দিন পরেই তরুণদার ফোন আমাকে, বললেন, 'শিবাজীবাবু আপনাকে দিয়ে কাজ করানোর আমার খুব ইচ্ছে বাসনা। অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছি। একটা ছবি করব। যাতে রবীন্দ্রনাথের গান থাকবে সব। আমি চাই, আপনি ও অরুন্ধতী দুজনে মিলে এই ছবির সংগীত পরিচালনা করবেন।' আমি বললাম, 'ভালো কথা কোনও অসুবিধা নেই। আমার স্বপ্ন ছিল আপনার ছবিতে সংগীত পরিচালনা করব। সেটাই হতে যাচ্ছে যখন আমার আনন্দের সীমা নেই।'

তরুণদার তখন অফিস ছিল নিউ থিয়েটার্স স্ট‌ুডিয়োতে। তখন তরুণদার ঘরে ঢুকলেই একটা অন্যরকম অনুভুতি হত। ওনার বসার চেয়ারের  পিছনে বড় স্বামী বিবেকানন্দের ছবি ছিল। জানলা দিয়ে গাছ-জঙ্গল দেখা যেত। এক সুন্দর পরিবেশ। চেয়ারে বসে টেবিলে কেবল লিখে যাচ্ছেন। ওনার হাতের লেখাটা তো খুব সুন্দর। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে বললাম হয়তো 'আসব দাদা'। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, 'আসুন আসুন'। সেই অফিসে বসে কত গল্প করতেন।

ALSO READ| Tarun Majumdar: তনুদা সিনেমার গল্পের সঙ্গে গানকে বুনে দিতেন

'পলাতক' ছবির গল্প বলছিলেন। এই ছবিতে উত্তম কুমার কাজ করতে চেয়েছিলেন। সে কথা উত্তম কুমার তরুণবাবুকে বলতেই তরুণবাবু বলেছিলেন, 'অনুপ কুমারকে ভেবেই আমার এই গল্পের  চিত্রনাট্য তৈরি করেছি। আপনাকে মানাবে না।' সেই সময় এই ছবি করার জন্য কোনও প্রযোজক পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন ভি শান্তারাম এগিয়ে এসেছিলেন ছবি প্রযোজনা করার জন্য। তার পরে তো ইতিহাস সৃষ্টি হল। প্রচুর সুনাম অর্জন করল ছবি। হেমন্তদার সংগীত পরিচালনায় এই ছবির গানও হিট হল।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের তখন শরীর ভালো না। তরুণদাকে বললেন, 'এই ছবির গান তো একটু লোক আঙ্গিক ঘেঁষা। আমাকে না দিয়ে আপনি শচীন কর্তাকে দিয়ে করান।' তরুণদা কোনও কথা শুনতেন না, ওনার এতটাই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের উপর আস্থা ছিল।

তরুণদা আমাকে এবং অরুন্ধতীকে সব সময় আপনি করে সম্বোধন করতেন। যতবার বলেছি, তুমি বলুন। কিছুতেই শুনতেন না। আমার থেকেও বেশি অরুন্ধতীকে ভরসা করতেন। ওঁর গানের জন্য। গানটা তরুণদার ছবির তো প্রাণ। অরুন্ধতী ওনার এত প্রিয় ছিল, ওই কণ্ঠটা চাই তাঁর ছবির জন্য। তরুণদা কখন কী চাইছেন সেটা আবার আমি খুব ভালো রিড করতে পারতাম। এই কারণেই আমিও তরুণ মজুমদারের কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলাম। আমার মনে হয়, খুব কম পরিচালকই তরুণদার মতো সংগীতকে ছবিতে এত সুন্দর ভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন। 

ALSO READ| Remembering Tarun Majumdar by Prosenjit: তনু জেঠুর কাছে অভিনয়ের পাঠ, ছিলেন কড়া শিক্ষক