Tarun Majumdar: তনুদা সিনেমার গল্পের সঙ্গে গানকে বুনে দিতেন

তরুণ মজুমদারের (Tarun Majumdar) ছবিতে গানের প্রিলিউড, ইন্টারলিউড মিউজিক কত সেকেন্ডের থাকবে, সেইসময় ছবিতে কী কী দেখানো হবে, সেগুলিও উল্লেখ থাকত ওনার চিত্রনাট্যে।

Tarun Majumdar: তনুদা সিনেমার গল্পের সঙ্গে গানকে বুনে দিতেন
তরুণ মজুমদারের সঙ্গে সংগীত পরিচালক শান্তনু বসু

'আলো' ছবি করার পরে আমার সামনে তরুণ মজুমদারকে ফোন করে মৃণাল সেন বলেছিলেন, 'আপনি মশাই কী করে যে গানকে এত সুন্দর ভাবে দৃশ্যায়িত করেন, আমি তো ভাবতেই পারি না।'...   স্মৃতির সরণিতে হাঁটলেন শান্তনু বসু (#SantanuBasu), তরুণ মজুমদারের শেষ ছবি 'ভালবাসার বাড়ি'র তিনিই ছিলেন সংগীত পরিচালক।

লেথক পরিচিতি: সংগীত পরিচালক, সংগীত আয়োজক ও শিল্পী

তরুণ মজুমদারের মতো বিশাল এক ব্যক্তিত্বের কাছে আমি যে ভালোবাসা, প্রশ্রয় ও স্বাধীনতা পেয়েছি, তা আমার সারা জীবনের সম্পদ। গানকে কী ভাবে ছবির গল্পের সঙ্গে সুগভীর ভাবে বুনে দিতে হয়, তার বিরাট এক দৃষ্টান্ত তিনি। রবীন্দ্রসংগীতকে ওঁর মতো আর কেউ ব্যবহার করতে পারেননি। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar) ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জুটি রবীন্দ্রসংগীতকে জনমানসে যে ভাবে সিনেমার মাধ্যমে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছেন, তা অভাবনীয়। সংগীত পরিচালনার ক্ষেত্রে তরুণ মজুমদারের ছবিতে শেষ যে নামটি লেখা থাকবে সেটা আমার। কারণ, ওঁর শেষ ছবি 'ভালবাসার বাড়ি'র সংগীত পরিচালক ছিলাম আমি (Santanu Basu)। এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি হয়ে থাকবে।

ওনার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখেছি। তরুণ মজুমদারের (Tarun Majumdar) ছবিতে গানের প্রিলিউড, ইন্টারলিউড মিউজিক কত সেকেন্ডের থাকবে, সেইসময় ছবিতে কী কী দেখানো হবে, সেগুলিও উল্লেখ থাকত ওনার চিত্রনাট্যে। সেই অনুযায়ী আমাদের মিউজিক পার্ট করতে হত।

আমি ওনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে কাজ করছি 'আলো' ছবি থেকে। আমার ইনভলমেন্ট ছিল একেবারে অন্য ভাবে। প্রত্যেকটা রেকর্ডিংয়ের আগে টেলিফোনে আলাদা করে কথা বলতেন। বলতেন, 'আমি এইটা চাইছি বুঝলেন, আপনাকে কিন্তু এইটা ভাবতে হবে।' এই যে ছোট ছোট প্রত্যেকটা জিনিস আজকের দিনে খুব মনে পড়ছে। এই মুহূর্তে ওনার একটি ছবির দৃশ্যায়নের কথা মনে পড়ছে--  নিমন্ত্রণ ছবিতে 'দূরে কোথায় দূরে দূরে' গানটি ছবিতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায়। ওই যে দৃশ্যে তাল ছাড়া এই গানটিকে ব্যবহার করে তনুদা ছবির বিষয়ের সঙ্গে এমন ভাবে বেঁধে দিলেন, যা দেখলে বা শুনলে  মনটা উদাস হয়ে যেতে বাধ্য।

আজকাল অনেকেই মনে করেন রিদিম দিয়েই বোধ হয় সবাইকে আটকে রাখা যাবে। কিন্তু যদি পরিকল্পনা ঠিক থাকে এবং গাওয়া যদি ভালো হয় এবং সঠিক গান নির্বাচন করা যায়, সেটা রবীন্দ্রসংগীত হোক বা মৌলিক গান--- তা যে মানুষের মনে দাগ কেটে দিতে পারে, সেটা তরুণ মজুমদার তাঁর প্রতিটি ছবিতে প্রমাণ করেছেন।

তরুণ মজুমদারের শেষ দিকের ছবি 'আলো', 'চাঁদের বাড়ি' ও 'ভালোবাসার বাড়ি' তাতেও গানের দিক থেকে কোনওরকম খামতি রাখেননি। আমার এখনও মনে পড়ে 'আলো' ছবি করার পরে আমার সামনে তরুণ মজুমদারকে ফোন করে মৃণাল সেন বলেছিলেন, 'এই সময় দাঁড়িয়ে আপনি যে এই রকম একটা ছবি করার সাহস দেখিয়েছেন, এই জন্য আপনাকে কুর্নিশ জানাই।' আরও বলেছিলেন, 'আপনি মশাই কী করে যে গানকে এত সুন্দর ভাবে দৃশ্যায়িত করেন, আমি তো ভাবতেই পারি না।'

ALSO READ| Tarun Majumdar: যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে...

'আলো' ছবির গান 'শ্রাবণের ধারার মতো' ব্যবহারের কথা বলি, এই গানে একটা কঠিন টাস্ক তনুদা আমাকে দিয়েছিলেন। 'আলো' ছবিতে দেখানো হয়েছে গ্রামের মানুষের মধ্যে কোনও জ্ঞানের আলো ঢোকেনি। আলো চরিত্র যেটা ঋতুপর্ণা করেছিলেন, যখন বিয়ে হয়ে গ্রামে যাচ্ছেন, ওঁর গানের মাধ্যমে ওঁর চলা-বলার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের মধ্যে যেন জ্ঞানের আলো ঢুকছে। তাদের চিন্তাশক্তির মধ্যে একটা নতুন আলোর স্পন্দন দেখা যাচ্ছে। সেই সময় তনুদা আমায় বলেছিলেন, 'আপনাকে কিন্তু ইন্টারলিউড মিউজিকটা সেই ভাবেই বানাতে হবে। সেটা একটা কঠিন কাজ ছিল। উনি আমাকে একটা সূত্র দিয়েছিলেন। সেই সূত্রটা থেকেই তৈরি করেছিলাম ইন্টারলিউড। আমার তখন সংশয় ছিল, যেটা ভাবছি সেটা ঠিকঠাক হবে তো। ইন্টারলিউডে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের মোজার্টের সিম্ফনি ভেঙে করেছিলাম। সেটার তারিফ আজও সংগীতবোদ্ধারা করেন। আবার আর একটি গান 'আমার রাত পোহালো'তে ইন্টারলিউড মিউজিক ব্যবহার করেছিলাম 'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে'র সুর।

তনুদা ওনার ছবিতে মিউজিক করার ক্ষেত্রে যে ভাবে স্বাধীনতা দিয়েছেন, সেটা ভাবা যায় না। তরুণ মজুমদারের ছবি 'আলো'তে আমি ছিলাম সংগীত আয়োজক। এ বারে যেটা হল, আমরা তখন ফ্লোরে কাজ করছি। আলোর টাইটেল মিউজিক আমিই করছিলাম। সেটাও একটা টাফ জব ছিল। একটা কবিতা, সেই কবিতার মাপ বলে দিয়েছিলেন তনুদা। কবিতাটির প্রতিটি পার্ট ছিল পাঁচ বা ছয় সেকেন্ডের। তার পরে মিউজিক পার্টও ছয় বা আট সেকেন্ডের। টাইটেল সং রেকর্ড হওয়ার পরে তনুদা আমার পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন, 'শান্তনুবাবু খুব ভালো লাগল এই কাজটা। এইচএমভি থেকে 'আলো' ছবির গান যখন সিডি আকারে বেরোবে, তখন তরুণ মজুমদার বললেন, 'আমার এই ছবির টাইটেল মিউজিকটাও কিন্তু একটা গান। সেটা কিন্তু আপনারা ক্যাসেট বা সিডিতে রাখবেন।' রাখাও হয়েছিল।

ALSO READ| Tarun Majumdar: 'চাঁদের বাড়ি' অন্ধকার করে চলে গেলেন 'গণদেবতা'র স্রষ্টা তরুণ মজুমদার 

পরদিন রেকর্ডিং স্ট‌ুডিয়োতে আমরা সবাই আছি হঠাৎ তনুদা শিবাজীদাকে ডেকে বললেন, শিবাজীবাবু আপনার কাছে এবং সবার কাছে একটা প্রস্তাব আছে, আমি আমার ছবিতে শান্তনুবাবুকে পেয়েছিলাম সংগীত আয়োজক হিসেবে। কিন্তু ওনার যে কন্ট্রিবিউশন তাতে আমি ওনার পদোন্নতি চাই। আপনারা কি সবাই একমত? সবাই ভাবছেন কী হবে কী হবে? তনুদা বললেন 'শান্তনুবাবুকে সহকারী সংগীত পরিচালক হিসাবে আমি রাখতে চাই।' সবাই এক কথায় রাজি হলেন। এমনই এক মানুষ ছিলেন পরিচালক তরুণ মজুমদার। যাঁর সবদিকেই নজর থাকত।