Musician Dilip Roy || এক অনন্য বেহালা শিল্পী  ও  সংগীত পরিচালক 

দিলীপ রায় (Musician Dilip Roy) বেহালায় সারিন্দার সুর তুলতে পারতেন। স্টুডিয়োতে তিনি সারিন্দার স্টাইলে বেহালায় সুর তুলতেই মানিকদা বলে উঠলেন, 'এই তো এই তো সারিন্দা কে বাজাল, এই বাজনাটাই তো চাই!...'

Musician Dilip Roy || এক অনন্য বেহালা শিল্পী  ও  সংগীত পরিচালক 

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় শিয়ারশোল রাজবাড়িতে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ এসেছিল। সেই অনুষ্ঠানে গান শুনে রাজামশাই একটি বেহালা উপহারস্বরূপ দিলেন। সেই বেহালা আজীবন সবকিছু হয়ে থেকেছে দিলীপ রায়ের জীবনে। ১৫ অগস্ট বেহালা শিল্পীর জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য। লিখেছেন সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায় 

ভায়োলিন নাকি বেহালা? নাকি দিলীপ রায়? ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকেই একাত্ম হয়ে গিয়েছিল এই তিনটি শব্দ। প্রায় পাঁচ দশকের উপর তাঁর বেহালার সুরে উদ্বেল হয়েছিল বাঙালি শ্রোতা। ফিল্ম থেকে নন-ফিল্ম যে কোনও গানের প্রিলিউড, ইন্টারলিউড আর গানের গায়ে জড়িয়ে থাকা মিউজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট তাঁর অনবদ্য ছড়ির টানে প্রাণ পেত। রবীন্দ্রসংগীতে সুচিত্রা কণিকা দেবব্রত থেকে আধুনিকে হেমন্ত সন্ধ্যা মানবেন্দ্র— সকলেরই একান্ত প্রিয় ছিলেন তিনি। সেই সময় হেমন্ত, সলিল, সুধীন, নচিকেতার মতো সুরকারেরা রেকর্ডিংয়ের দিন ঠিক করতেন এই মানুষটির অ্যাভেলেবিলিটির উপর। পরবর্তীকালে তাঁর এবং ভি বালসারার বেহালা ও পিয়ানোতে দ্বৈত বাদন উদ্বেল করে রাখত সুর-রসিকদের। সেই মানুষটি দিলীপ রায় (Musician Dilip Roy)

দিলীপ রায়ের (Musician Dilip Roy) জন্ম ১৯৩৫-এর ১৫ অগস্ট, পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জের কয়লাখনি এলাকায়। সাত ভাই বোনের মধ্যে দিলীপ তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই গানবাজনার প্রতি একটা আলাদা ঝোঁক ছিল। নিজে নিজেই বাঁশি বাজাতে এবং গান গাইতে পারত ছোট দিলীপ। স্কুলে অনুষ্ঠান হলেই ডাক পড়ত। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় শিয়ারশোল রাজবাড়িতে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ এল। সেই অনুষ্ঠানে সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া দিলীপের গান শুনে রাজামশাই তাঁকে একটি বেহালা উপহার স্বরূপ দিলেন। সেই বেহালা আজীবন সবকিছু হয়ে থেকেছে দিলীপ রায়ের জীবনে। পুরস্কারের সেই বেহালা নিত্যসঙ্গী হয়ে গেল।

প্রথম শিক্ষা রানিগঞ্জেরই তারকব্রহ্ম অধিকারী কাছে। সেই সময় রানিগঞ্জ অঞ্চলে প্রচুর নামডাক তারকব্রহ্মর। ক্লাসিক্যালের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রাদলেও বাজিয়ে হিসেবে নাম ছিল। বেশ কিছু বছর তারকব্রহ্ম অধিকারীর কাছে শিক্ষার ফলে দিলীপেরও ক্রমে ক্রমে নাম হতে লাগল। সেই সময় আসানসোলের এক অর্কেস্ট্রাতেও বাজাতেন। মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সে কলকাতায় রেডিয়োর 'গল্প দাদুর আসর' থেকে বাজানো শুরু। পরবর্তীকালে এই রেডিয়োতে কাজ করেছেন স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে।

নিজেকে আরও ঘষামাজা করতে সেইসময় ওস্তাদ দ্রবীড় খানের কাছে তালিম নেওয়া শুরু করেন দিলীপ রায়। সুরশ্রী অর্কেস্ট্রা, ক্যালকাটা অর্কেস্ট্রাতেও তিনি বাজিয়েছেন। একটা সময় কাজ করেছেন সালকিয়া ইয়ং অর্কেস্ট্রা, শিবপুর অর্কেস্ট্রাতেও। বিড়লাপুর স্কুলে মিউজিক টিচার হিসাবেও তিনি কাজ করেছেন। সেতার, গিটার, বাঁশি, বেহালা সবই শেখাতে হত তাঁকে। 

প্রথম ছবিতে কাজ সুরকার সন্তোষ মুখোপাধ্যায়ের অ্যারেঞ্জার হিসেবে, 'সাধক রামপ্রসাদ' ছবিতে। এই ছবিতে কুড়ি-বাইশ গান ছিল। গেয়েছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতো নামী শিল্পীরা। কলকাতায় তখন তিনটি অর্কেস্ট্রা। সুরশ্রী অর্কেস্ট্রা, ক্যালকাটা অর্কেস্ট্রা আর ন্যাশনাল অর্কেস্ট্রা। সমস্ত ছবিতে বাজানোর কাজ এই তিনটি অর্কেস্ট্রা করত। সেই সময় ডাক এল ক্যালকাটা অর্কেস্ট্রা থেকে। রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে 'পথে হল দেরি' ছবিতে বাজাবার জন্য। সেই ছবিতে গান গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তখন থেকেই দিলীপ রায় (Musician Dilip Roy) সমস্ত সংগীত পরিচালকের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। রবীন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত, অনুপম ঘটক প্রত্যেকেই সেই সময় আ্যরেঞ্জার হিসাবে দিলীপ রায়কে চাইতেন।

১৯৬১-র কথা, তরুণ মজুমদারের ছবি 'নাগিন কন্যার কাহিনী'র গান রেকর্ডিংয়ে বিয়ের বাসরের ধুতি পরেই বেহালায় সুর তুলেছিলেন সদ্যবিবাহিত দিলীপ। সেই ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। দিলীপের সঙ্গে দেখা হলে সে কথা মজা করে প্রায়ই বলতেন রবিশঙ্কর। 

পরিচালক তপন সিনহার সঙ্গে দিলীপ রায়ের সম্পর্কটা ছিল দাদা-ভাইয়ের। 'অতিথি' ছবির সময় থেকে সুসম্পর্ক। তাঁর বাজানো রবীন্দ্রসংগীতের সুর 'তোমার হল শুরু' শুনে প্রতিটি ছবির জন্য দিলীপকে সঙ্গী করে নেন কিংবদন্তি পরিচালক তপন সিনহা। এমনকি তাঁর শেষের দিকের 'অন্তর্ধান', 'হুইল চেয়ার', 'গুলাবী মতি' সহ ৫-৬টি ছবির সহকারী সংগীত পরিচালক ছিলেন দিলীপ রায়। সেই সময়ের প্রায় সমস্ত সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন দিলীপ রায়।

প্রথম দিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায় সংগীতায়োজক হিসেবে থাকতেন শৈলেশ রায়। পরবর্তীকালে ভি বালসারা ও দিলীপ রায় সংগীতায়োজক হিসাবে  কাজ করেছেন। পণ্ডিত রবিশংকরের 'শান্তিধ্বনি', আনন্দশংকরের সঙ্গে এবং এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য 'নমস্কার' —'মেলোডিস ফ্রম ইন্ডিয়া'র সংগীত পরিচালনা দিলীপ রায়ের। দিলীপ রায়ের সংগীত আয়োজনে আশা ভোঁসলের রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম আজও জনপ্রিয়।

রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়েরও প্রিয় ছিলেন দিলীপ রায়। তাঁর রবীন্দ্রসংগীতে সংগীত আয়োজক যেমন ছিলেন দিলীপ রায়, তেমনি অনেকেই হয়তো জানেন না চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় দু'টি ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন। সরোজ দে পরিচালিত 'বিসর্জন' এবং 'কোনি' ছবি দু'টি। এই দু'টি ছবির সহকারী সংগীত পরিচালক ছিলেন দিলীপ রায়। রেডিয়োর রম্যগীতিতে সলিল চৌধুরীর কথায় দিলীপ রায়ের সুরে সবিতা চৌধুরীর গান এখনও জনপ্রিয়। বাণী জয়রাম, উষা উত্থুপ, অমৃক সিং অরোরা, অনুরাধা পড়োয়াল, কুমার শানু, বাবুল সুপ্রিয় এই প্রজন্মের বহু শিল্পীর গান দিলীপ রায়ের সুরসৃষ্টিতে সমৃদ্ধ। তাঁর সংগীত পরিচালনায় 'নতুন সূর্য', এবং 'অনুরোধ' ছবি দু'টিতে গান গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আশা ভোঁসলে এবং অনুরাধা পড়োয়াল। সংগীত পরিচালনা করেছেন শেখর চট্টোপাধ্যের 'সীমানা' ও 'বসুন্ধরা' ছবিতে। পিসি সরকার জুনিয়র এবং ঈশ্বর চক্রবর্তীর পরিচালনায় 'গিলি গিলি গে' ছবির সংগীত পরিচালনাও দিলীপ রায়ের। অনেক গান ছিল এ ছবিতে। পিসি সরকার এবং উৎপল দত্ত অভিনয়ে ছিলেন। 'অন্বেষণ', 'কৃষ্ণ মহাবীর'-সহ বেশ কিছু ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন দিলীপ রায়। উৎপল দত্তের 'বৈশাখী মেঘ', 'ঝড়', 'গোর্কির মা' ছবির বিজিএম দিলীপ রায়ের তৈরি।

সত্যজিৎ রায়েরও প্রিয় যন্ত্রী ছিলেন দিলীপ রায়। তাঁর 'গুপী গাইন বাঘা বাইন', 'সোনার কেল্লা', 'হীরক রাজার দেশে' সহ বেশ কিছু ছবিতে দিলীপ রায়ের বেহালা বেজেছে। হীরক রাজার দেশে ছবিতে একটি গানে সারিন্দার দরকার ছিল। এই যন্ত্রটি ভিন্ন দেশে বিভিন্ন নাম। রাজস্থানের লোকগানের সঙ্গে বহুল ব্যবহৃত। সত্যজিৎ রায় তাঁর ছবির সঙ্গীতায়োজক অলোক নাথ দে-র কাছে খোঁজ করেছিলেন সারিন্দাবাদকের। অলোক নাথ দে জানতেন দিলীপ রায় বেহালায় সারিন্দার সুর তুলতে পারেন। স্ট‌ুডিয়োতে দিলীপ সারিন্দার স্টাইলে বেহালায় সুর তুলতেই মানিকদা বলে উঠলেন, 'এই তো এই তো সারিন্দা কে বাজাল, এই বাজনাটাই তো চাই!'

অলোক নাথ দে, ওয়াই এস মুল্কী, দিলীপ রায়—  এই তিন জন ছাড়া সেই সময়  কোনও রেকর্ডিং সম্ভব হয়ে উঠত না। দিলীপ রায় কেবল বেহালায় সুরই তুলতেন না, যে কোনও জটিল সুরকে অবলীলায় স্বরলিপিতে সাজিয়ে ফেলতে পারতেন। নিখুঁত ভাবে বুঝিয়ে দিতে পারতেন। যে কারণে খুব কঠিন সংগীতও সহজে শিল্পীরা তুলে নিতেন তাঁদের বাদ্যযন্ত্রে। এই দক্ষতার কারণে সত্যজিৎ রায়, পণ্ডিত রবিশঙ্কর থেকে তাবড় সংগীত পরিচালক এবং শিল্পীরা একান্ত ভাবে দিলীপ রায়কে চাইতেন রেকর্ডিং ফ্লোরে। বাংলা গানের স্বর্ণযুগ চিহ্নিত থাকবে দিলীপ রায়ের বেহালার  মুর্ছনায়। চিরকাল থেকে যাবে তাঁর অসাধারণ সুরসৃষ্টির সব গান। দিলীপ রায় প্রয়াত হন ২০১৮-র ১৬ মার্চ।

দিলীপ রায়ের (Musician Dilip Roy) জীবনস্মৃতি নিয়ে লেখা বই 'স্মৃতির খোঁজে' প্রকাশিত হল ইউডি এন্টারটেইনমেন্ট থেকে, তাঁর ৮৭তম জন্মদিনে। আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন সংগীতশিল্পী উষা উত্থুপ এবং তাঁর প্রিয় ছাত্র তথা সংগীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র।