আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি…

প্রবাদপ্রতিম শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সব গানের মধ্যেই একটা নাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপার ছিল!! তিনি মঞ্চে একেবারে ঢেউ তুলে দিতেন!! মান্না দে-কে বাদ দিলে বাংলার পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে আর কেউ মঞ্চের অনুষ্ঠানকে এমন একটা মাত্রায় তুলে দিতে পারতেন না।...

আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি…

…. 'কাল মানবদার ( অর্থাৎ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়) পাঁচ নম্বর গানটি ছিল আমার হয়ে তোমার জন্য গাওয়া… ।' তরুণের পত্রাঘাত আগের রাতে জলসায় প্রেমে পড়া তরুণীকে। কৌতূহল হওয়াটা স্বাভাবিক যে সেই পাঁচ নম্বর গানটি কী ছিল? বলা বাহুল্য, সেই পাঁচ নম্বর গানটিকে হতেই হতো… 'আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি, তবু মনে হয়…' আর সঙ্গে সেই হৃদয় কাঁপানো যন্ত্রানুসঙ্গ!! আহা !! প্রেম নিয়ে রচিত সমস্ত বাংলা আধুনিক গানের মালায় এই অপূর্ব গানটি যেন ওই মালার শ্রেষ্ঠ ফুলটি। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ৯২ তম জন্মদিনে শিল্পীকে ফিরে দেখলেন সুব্রত রায়

(লেখক পরিচিতি: ভারতের বৃহত্তম ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মী হিসেবে অবসরের পর, বিষয় ভিত্তিক লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন।)

এখন ২০২১ চলছে… গত শতকের ৫০-এর দশকের কথা বলছি। মধ্য কলকাতার ক্রিক রো-র বাসিন্দা, ভানু বোস ছিলেন সেই পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় গোড়ায়; শক্তিশালী, সাহসী, উদ্যোগী একজন গোষ্ঠীনেতা। ডাকাবুকো লোক ছিলেন এই ভানুদা। কালীপুজো থেকে শুরু করে নেতাজির জন্মদিন হয়ে দরিদ্রনারায়ণ ভোজন বা টেনিস বলের টুর্নামেন্ট সবই করতেন দুঁদে মস্তান ভানুদা। ১৯৫৩-৫৪ সালে শুরু হয়ে দেড়-দু'বছরের মধ্যেই ভানু বোসের ক্রিক রো-র জলসা এক ঐতিহাসিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে পর্যবসিত হয়। রেডিয়োর জনপ্রিয় অনুরোধের আসরের স্টাইলে, উঠতি শিল্পী দিয়ে শুরু করে বড় নামের গাইয়েদের সংগীত পরিবেশন তাতে যেমন থাকত, তেমনি থাকত তখনকার দিনের সব তারকার উপস্থিতি— সে উত্তম কুমারই হোন বা বিশ্বজিৎ। এখনকার দিন হলে হয়তো উত্তম কুমারকে স্টেজে উঠে শাপমোচন থেকে শুরু করে মৌচাক কিংবা অমানুষ ছবির সংলাপ আওরাতে হতো। তখন তো আর সেসব বালাই ছিল না, তাই উত্তম শুধু তাঁর সঙ্গে ভানু বোসের বন্ধুত্বের কথা কিংবা বাঙালির ভালোবাসা পাওয়ার কৃতজ্ঞতার কথাই বলতেন। তাতেই মানুষ পাগল হয়ে যেত। এইরকম ভাবেই একদিন বিশ্বজিৎও এসে দাঁড়িয়েছেন মঞ্চে। কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। অথচ, হিট ছবি 'মায়ামৃগ'র সৌজন্যে বিশ্বজিতের মুখে জনতা কিছু শুনতে চায়। তখনও তাঁর কোনও গানের রেকর্ড বের হয়নি।

এমন সময়ে স্টেজে উদয় হলেন ধুতি-চাদরে এক সুপুরুষ বাঙালি কণ্ঠশিল্পী— মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় (Manabendra Mukhopadhyay)। অতঃপর মানববাবু বিশ্বজিৎকে দেখিয়ে, হাজার হাজার বিনে পয়সার দর্শক-কাম-শ্রোতার দিকে তাকিয়ে বলে উঠতেন, 'আপনারা ওঁকে দেখুন আর আমার গান শুনুন।' বলেই শুরু করতেন…  'ক্ষতি কি না হয় আজ পড়বে, মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য'... ব্যস! এই জমকালো গান শুরু করার পর এক মিনিট ধরে পাবলিকের হর্ষধ্বনির তোড়ে কারও কিছু শোনার উপায় থাকত না। এমনকী সত্তরের দশকে, মফস্‍‌সল শহরে ছোটবেলা কাটানো এই অধমও রেডিয়োতে ছায়াছবির অনুষ্ঠানে এই 'মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য' শুনে বড় হয়েছিল। এরকম কম্পোজিশন খুব একটা শোনা যায় না। 

ALSO READ। অন্তরতর হে...


আরও আছে! ক্রিক রো-র এই রাতভর ফাংশনে হাজির থাকতেন ওই মহল্লা আর সংলগ্ন তিন-চার পাড়ার মা-বোন-মাসিরা। সুন্দর সুন্দর সব খয়েরি, বেগুনি, সুলেখা নীল, রামধনু রঙের শাল জড়িয়ে মেয়েরা দল করে গিয়ে বসতেন, প্রেমের গানে কাঁদতেন, মানবেন্দ্র-শ্যামল-নির্মলেন্দু এবং আরও অনেকের গান বুঁদ হয়ে শুনতেন, জহর-ভানুর কমিকে হেসে গড়িয়ে পড়তেন, উত্তম-বিশ্বজিৎকে দেখে আরক্ত ও চিত্রার্পিত হয়ে পড়তেন। সুন্দরী মেয়েদের দর সেদিন একলাফে  সুচিত্রা সেনের কাছাকাছি চলে যেত। আর যুবকবৃন্দও তাদের চোখে পড়বার জন্য জ্যাকেট, স্যুট ও ধুতি-পাঞ্জাবি কম্বিনেশনে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ত। খুচখাচ কিছু অ্যাফেয়ার তো হয়ে যেতেই পারে। পরদিন হয়তো শুরু হয়ে যেত আলাপ হওয়া সুন্দরীকে পত্রাঘাত (আজ্ঞে হ্যাঁ, সেই সোনালি দিনগুলোতে চিঠি বলে একটা বস্তু ছিল!)। তাতে কোটেশন থাকত জলসায় শোনা গানের লাইন। হয়তো কোনও রোম্যান্টিক যুবক সেই সুন্দরীকে লিখলেন,

…. 'কাল মানবদার (অর্থাৎ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়) পাঁচ নম্বর গানটি ছিল আমার হয়ে তোমার জন্য গাওয়া… ।' কৌতূহল হওয়াটা স্বাভাবিক যে সেই পাঁচ নম্বর গানটি কী ছিল? বলা বাহুল্য, সেই পাঁচ নম্বর গানটিকে হতেই হতো… 'আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি, তবু মনে হয়…' আর সঙ্গে সেই হৃদয় কাঁপানো যন্ত্রানুসঙ্গ!! আহা !! প্রেম নিয়ে রচিত সমস্ত বাংলা আধুনিক গানের মালায় এই অপূর্ব গানটি যেন ওই মালার শ্রেষ্ঠ ফুলটি।

ALSO READ। আমার প্রতিদিনের বাইশে শ্রাবণ


প্রবাদপ্রতিম শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (Manabendra Mukhopadhyay) সব গানের মধ্যেই একটা নাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপার ছিল!! তিনি মঞ্চে একেবারে ঢেউ তুলে দিতেন!! মান্না দে-কে বাদ দিলে বাংলার পুরুষ শিল্পীদের মধ্যে আর কেউ মঞ্চের অনুষ্ঠানকে এমন একটা মাত্রায় তুলে দিতে পারতেন না। আড্ডার মেজাজ তৈরি করা, গানের ফাঁকে ফাঁকে গল্প করা- এসবই মঞ্চে করে, একটা আবেশ তৈরি করতেন মানবেন্দ্রবাবু, ওই মান্না দে-র মতোই। রাগকেন্দ্রিক মান্না দে-র সঙ্গে মানবেন্দ্রর আরও একটা ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। মান্না দে যেমন তাঁর কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কথা বলতে অজ্ঞান ছিলেন, মানবেন্দ্রও তেমনি বড় হয়ে উঠেছিলেন তাঁর দুই কাকা—  রত্নেশ্বর এবং সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে সামনে রেখে। সেই সময়কার কলকাতায় এই দু'জনই ছিলেন ক্লাসিকাল আর কীর্তন গানে একেবারে কিংবদন্তি-সম।

ALSO READ। রবীন্দ্রনাথ এবং বাইশে শ্রাবণ

কিংবদন্তি মেহদি হাসান ছিলেন মানবেন্দ্রবাবুর অন্যতম প্রিয় শিল্পী। একবার মেহদি হাসানের ফাংশন দেখতে গিয়েছেন মানববাবু । 'রঞ্জিশ হি সহি দিল হি দুখনে কে লিয়ে আ'… এই গানটি মেহদি একেবারে অন্য স্টাইলে গাইলেন দেখে মানববাবু তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন—  ‘ইমন রাগের গানটা,  ফাংশনে এত অন্যরকম ভাবে গাইলেন কেন? ‘মেহদি হাসান যা উত্তর দিয়েছিলেন তা শুনে মানবেন্দ্র যাকে বলে অভিভূত! মেহদি বলেছিলেন— 'ম্যায় তো আভি জিন্দা আর্টিস্ট হুঁ, মুর্দা নহি!' এই গল্প শুনলে বোঝা যায় ফাংশনে কেন নিজের গান নিয়ে সুরের আর রাগের খেলায় মাততেন এই অবিস্মরণীয় শিল্পী। তাঁর কয়েক'টা গানের নমুনা দেওয়া যেতে পারে যেখানে কিছু বিশেষ রাগ নিয়ে খেলা করেছেন মানবেন্দ্রবাবু। 

না যেও না মধুযামিনী— হংসধ্বনি 

বারেবারে কে যেন ডাকে আমাকে— খাম্বাজ 

ছিল চাঁদ মেঘের পারে— পুষ্পচন্দ্রিকা

বনে নয় মনে মোর পাখি আজ গান গায়— কিরওয়ানি 

বিরহিনী চির বিরহিণী— যোগকোষ 

ফাগুনের বাঁশিখানি হাতে কে লবি— দুর্গা 

এমনি করেই পড়বে মনে বাকি জীবন ধরে— বাগেশ্রী ।

গান নিয়ে অসম্ভব passionate ছিলেন মানবেন্দ্রবাবু। গানের কথা ভাবতে গিয়ে কখনও বা কেঁদেই ভাসাতেন আবার কখনও বা সুরকারের সঙ্গে তীব্র ঝগড়া পর্যন্ত করতেন। এখন মনে হয়, প্রেমের গানগুলোতে কী যে অদ্ভ‌ুত কিছু মোচড় দিতেন তিনি, ভাবা যায় না !! আবারও কয়েক'টা নমুনা দিতে ইচ্ছে করছে। 

১. যদি আমাকে দেখো তুমি উদাসী... এই গানটির সঞ্চারীর জায়গাটা একবার ভাবুন ! ‘যদি আমার কাছে এসে মনে হয়, এসেছ মরুর তীরে তুমি'… উদাস হয়ে যায় মনটা।

২. আমি যে কত একেলা, তোমারই পথ চেয়ে চলেছি… বিশেষ করে, ‘তুমি কি তা জানো না, তুমি কি তা মানো না, আমি যে কত একেলা'…  এই জায়গাটার কথা ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় যেন !!

৩. আমার হ্রদয় নিয়ে আর কতকাল বলো কাছে এসে দূরে দূরে থাকবে… যখন বলে উঠতেন … ‘মনের সুরভিটুকু মনে লুকায়ে তুমি রাখবে… কী নিবেদনই না ফুটে উঠত।

৪. তার চুড়িতে যে রেখেছি মন সোনা করে… এই গানটির ও সঞ্চারীটা ভাবুন! 'দিনের মুখর চুড়ি নীরব রাতেরও শয্যায় সে হাতে বুকের পরে ছুঁয়েছে হ্রদয় তারি লজ্জায়'… কী অপূর্ব!

৫. এই নীল নির্জন সাগরে… ওই জায়গাটার কথা ভাবুন! 'যেতে যেতে শুধু চোরা হাওয়া'… চোরা হাওয়াটাকে মন অদ্ভ‌ুত ভাসিয়ে দিতেন !! এ এক অদ্ভ‌ুত শৈলী মানবেন্দ্রবাবুর।

আরও কত অসংখ্য আধুনিক বাংলা গান গেয়ে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন এই বরেণ্য শিল্পী, ১৯২৯ সালের ১১ অগস্ট যাঁর জন্ম হয়েছিল এই কলকাতা শহরে। আরও কিছু গান বরং ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই। ঘুমায়ো না সহেলি গো, এমনি করে পড়বে মনে, আমি পারিনি বুঝিতে পারিনি, যদি জানতে, ছিল চাঁদ মেঘের ও পারে, ও আমার চন্দ্রমল্লিকা, সেই চোখ কোথায় তোমার, এই মৌসুমী মন শুধু রং বদলায়, তুমি ফিরায়ে দিয়েছ মোরে, মুক্ত ছড়া নেইকো কন্যা নেইকো মতির হার, মিথ্যে কাচের আর্শিতে মুখ দেখো না সজনী, এক জনমের ওগো ছোট এ জীবনে, তুমি আসবে সে তো জানতাম, হাজার জনম  ধরে তোমারই ছিলাম, হালকা মেঘের পালকি চড়ে চন্দ্রকলা যায়, এই নীল নির্জন সাগরে এলোমেলো ঢেউয়ে, ঘুমালো রাতের চাঁদ মেঘের শয়নে ওই, এখনও এই রাত অনেক বাকি, ওগো এই তো বেশ…  এরকম কত কত মায়াজড়ানো গান আছে মানবেন্দ্রবাবুর, রাত ভোর হয়ে যাবে যদি আলোচনা করতে বসি।

ALSO READ। বাইশে শ্রাবণ, কবিগুরু পাড়ি দিলেন অমরত্বের পথে 

গায়ক মানবেন্দ্রকে আলোচনা করতে গিয়ে সুরকার মানবেন্দ্রকে ভুললে আবার চলবে না!! নিজের গাওয়া কত বিখ্যাত গানের সুর দিয়েছেন তা আমরা অনেকেই হয়তো জানি না। আমি নিজেই কি ছোটবেলা বা যৌবনে খতিয়ে দেখেছি যে… “ আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি, ওই মৌসুমী মন কত রং বদলায়, আমি যে কত একেলা-র মতো কত কত গানের সুরসৃষ্টি স্বয়ং মানবেন্দ্রর নিজের করা। আর অন্য শিল্পীদের গলায় মানবেন্দ্রবাবুর সুর করা আধুনিক গান? দু-একটা নমুনা দিই?… তখনকার দিনের প্রখ্যাত শিল্পী আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়, 'মন বলছে আজ সন্ধ্যায় কিছু বলতে তুমি আসবে কি?'… অসম্ভব জনপ্রিয় এই গানটি আজও শুনলে মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। সুপ্রীতি ঘোষের 'গানে গানে আমি খুঁজি তোমায়', বাণী ঘোষালের 'কুয়াশায় ঘেরা নীল পাহাড়ে', ইলা চক্রবর্তীর (বসু)—  'প্রেম যদি মোর অভিশাপ হল', গায়ত্রী বসুর—  'সুখে দুঃখে আমি তোমায় পাবো', তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের—  'চম্পাকলি গো কত নামে' আশির দশকের শেষ দিকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের— ' অনেক চেনা মুখ'। তার পর মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের গলায় গাওয়া , ‘একবার ব্রজে চলো ব্রজেশ্বর দিনেক দুয়ের মতো' (উত্তরপুরুষ ছবি ) কীর্তনাঙ্গে যা সুর করেছেন মানববাবু, ইতিহাস তার সাক্ষী থাকবে। কিংবা মান্নাবাবুর গলায় 'কেন ডাকো মিছে পাপিয়া' ( সুদূর নীহারিকা ছবিতে ) অথবা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জয়জয়ন্তী ছবিতে—  ‘ কেন ডাকো বারে বারে আমারে’,  এই এক একটা গানই যেন এক একটা মাইলস্টোন। 

এই প্রসঙ্গে প্রচুর বাংলা ছবিতে সংগীত পরিচালনার মতো দুরূহ কাজটিও অনায়াসে করেছেন। ১৯৫৩ সালে খোদ গীতিকার স্বনামধন্য সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে ‘চাঁপাডাঙার বউ' ছবিতে সংগীত পরিচালনার কাজ শুরু করেন। উল্লেখযোগ্য কতগুলো ছবির নাম বলি যেগুলোতে সুরারোপ করে অত্যন্ত প্রশংসিত হন। ‘শচীমার সংসারট, 'সুদূর নীহারিকা', 'যত মত তত পথ', 'নিষ্কৃতি', 'মায়ামৃগ', 'সাঁঝের প্রদীপ', 'হ্রদ', 'রক্তপলাশ', 'বধূ', 'মুখুজ্যে পরিবার',  'দেবী চৌধুরাণী', 'আগুনের ফুলকি' এবং 'জয়জয়ন্তী' … এই ছবিগুলোর কথা না বললেই নয় !!

আমার ছোটবেলায়, আমার এক পিসতুতো দাদার বাড়িতে রেকর্ড প্লেয়ার ছিল, তাই হ্যাংলার মতো তাঁর বাড়িতে জয়জয়ন্তী ছবির গানগুলো বারবার শুনোর জন্য তাঁকে কত যে বিরক্ত করতাম। গানগুলোর কথা বলবার লোভ সামলাতে পারছি না… ‘কে প্রথম চাঁদে গ্যাছে', 'আমরা তো আর ছোট নই',  'চলছে রেলের গাড়ি', 'আমাদের ছুটি ছুটি চল নেব লুটি'…  ভাবলে ছোটবেলাটাই যেন উঠে আসে। এর পরে একটু হলেও ছায়াছবির গানে তাঁর অবদানের কথা বলতেই হয়। সেই লালুভুলু , নিষ্কৃতি, নবজন্ম, মায়ামৃগ, দেয়ানেয়া থেকে শুরু করে নিধিরাম সর্দার পর্যন্ত সে এক যেন এক সুহানা সফর !! ছায়াছবির গানের ক্ষেত্রে, শ্যামল ও মানবেন্দ্রর যুগলবন্দিতে 'দোলে দোদুল ঝুলে ঝুলো না' ... যেন এক ইতিহাস রচিত হল।

এ বারে আসব মানবেন্দ্রবাবুর গাওয়া নজরুলগীতির প্রসঙ্গে !! ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৪… এই সময়টাতে এই অধম রচয়িতার বয়স চলছে ৬ থেকে ১৩। বাড়িতে রেডিয়োই ভরসা,  বিভিন্ন ধরনের গান শুনোর জন্য । মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ঠিক এই সময়টাতে যে সব রাগাশ্রয়ী নজরুলগীতি রেকর্ড করেছিলেন, তার সবক'টিই ছিল সুপারহিট। মানুষ যে কোনও জলসায় তাঁকে যে গানটি না করলে, মঞ্চ ছাড়তে দিত না, সেই  'বাগিচায় বুলবুলি তুই' তো আছেই … এ ছাড়া আরও যে গানগুলো মানুষের মনপ্রাণ আকুল করে দিয়েছিল সেই গানগুলো হল, … বউ কথা কও, এত জল ও কাজল, ভরিয়ে পরান শুনিতেছি গান, কোন কূলে আজ ভিড়ল তরি, মুসাফির মোছ রে আঁখিজল, অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি, আধো আধো বোল, রিম ঝিম ঝিম রিম ঝিম, আলগা করো গো, পিয়া পিয়া পিয়া, কেন কাঁদে এ পরান ইত্যাদি। এমন তো নয় তখন নজরুলগীতি গাওয়ার লোক ছিল না, এখনকার মতো।  শ্রদ্ধেয় ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, ধীরেন বসু, সুপ্রভা সরকার, ড. অঞ্জলি মুখোপাধ্যায় কিংবা ফিরোজা বেগম তো ছিলেনই , পূরবী দত্তও ছিলেন এই সময়টাতে… তবু অন্তত আমার মতো সামান্য জনতার মনে নজরুলগীতি জিনিসটা কী, তা বোঝানোর জন্য মানববাবুর গানই যথেষ্ট ছিল। মানবেন্দ্রবাবু কিংবা অনুপ ঘোষালের পরে, নজরুলগীতি গেয়ে, সে রকম মানুষের মনে দাগ কেটেছেন এরকম বাঙালি গায়ক-গায়িকার কথা সে ভাবে মনে আসছে না।

আমার ছোটবেলায় আমার মাতৃদেবীর কাছে কত যে মানববাবুর গল্প শুনতাম। তার কারণ হল, মা-র কাকা ছিলেন কবি শৈলেন রায়, যাঁকে মানববাবু অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। আমার এই মনিদাদুর লেখা লালুভুলু ছবির গান থেকে শুরু করে সেই বিখ্যাত গান… বিরহিণী চির বিরহিণী; এসবই মানববাবুর গলায় মানুষ শুনেছে ও ভালোবেসেছে। ছুটিছাটায় আমার মা, শ্যামবাজারের ন্যায়রত্ন লেনে তাঁর মনিকাকার বাড়িতে প্রায়ই থাকতেন। তখন এই মানবেন্দ্র বা মান্না দে-রা শৈলেন রায়ের কাছে যখন আসতেন, আমার মা-র উপরে ভার পড়ত এইসব কিংবদন্তিদের চা করে খাওয়ানোর। ছোটবেলায় মা-র মুখে যখন এইসব শুনতাম, তখন মা-কে ততটা পাত্তাই দিইনি…  আসলে এর মর্ম বোঝার মতো মন হয়নি তখন। এখন ভাবি, আমার মা কত ভাগ্যবতী ছিলেন। মান্না-মানবেন্দ্রকে চা করে খাওয়ানো ! বাপরে! 

আসলে এতটাই ব্যাপ্তি ছিল সব ধরনের গানে সিদ্ধহস্ত এই শিল্পীর, যে এত ছোট পরিসরে তাঁকে ধরবার সাধ্য অন্তত এই কলমচির নেই ! তাঁকে নিয়ে কত ঘটনা যে গল্পের রূপ পরিগ্রহ করেছে তার ইয়ত্তা নেই !! আমি একটু সংকেত দিই … ১) দেয়ানেয়া ছবিতে মানবেন্দ্রবাবু  ডুয়েট গাইবেন শ্যামলবাবুর সঙ্গে; পরিচালক তাঁকে বললেন, একটু খারাপ করে গাইতে, কারণ নায়ক গান জানলেও নায়কের বন্ধু অত ভালো গাইতে জানে না! সংবেদনশীল মানববাবু কী বললেন এর উত্তরে? ২) বনে নয় মনে মোর গানটি তৈরির সময় সুরকার নচিকেতাবাবুর সঙ্গে কী নিয়ে বিরোধ হয়েছিল!  ৩) দেবব্রত বিশ্বাস কে ঘুম থেকে উঠিয়ে একটা রবীন্দ্রসংগীত শিখতে গিয়েছিলেন মানববাবু, সেখানে কী ঘটেছিল!  ৪) সলিলবাবু লতাকে দুটো গান হিন্দিতে তোলাবেন; লতা বলছেন এ গান ভীষণ কঠিন!! সলিলবাবু তাঁকে বললেন যে ইতিমধ্যেই এই গান বাংলাতে মানববাবু গেয়ে ফেলেছেন। কলকাতায় হোপ-৮৬ অনুষ্ঠানে মানববাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে শ্রদ্ধাবনত লতাজি স্বয়ং এই কথা জানিয়েছিলেন মানববাবুকে । ৫) অন্তরঙ্গ বন্ধু মহানায়ক উত্তম কুমার প্রযোজিত একটি ছবিতে সুর দেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন, কিন্তু কেন ?  ৬) শ্রদ্ধেয় মান্না দে, মানবেন্দ্রবাবুর সুরারোপে গান গাইবেন, তাই রিহার্সাল করছেন মানববাবুর যাদবপুরের নর্থ রোডের বাড়িতে; রিহার্সাল করতে করতে মান্নাবাবু বলছেন, 'না না, মানববাবু, এই গান আপনার গলায় যত ভালো আসবে, আমার ঠিক ততটা হচ্ছে না'; মানববাবু আবার বলছেন, 'কী বলছেন মান্নাদা, কী সুন্দর গাইছেন আপনি !!'  একরকমই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল কিংবদন্তি দুই শিল্পীর মধ্যে  ৭)  প্রিয় বন্ধু এবং তাঁর সুর করা প্রচুর গানের কথা লিখেছিলেন যে শ্যামল গুপ্ত… সেই শ্যামলবাবুর গান লিখে আনা কাগজ, রাগ করে জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন মানববাবু এই বলে, ‘এটা কিস্যু হয়নি !' আবার কিছুক্ষণ পরে বলছেন, ‘না রে, মনে হচ্ছে গানটা ভালোই হবে… দে তো কাগজটা !!' তার পরে দুই বন্ধু মিলে সন্ধ্যাবেলায় টর্চ নিয়ে খুঁজতে লাগলেন সেই রাস্তায় ফেলে দেওয়া কাগজের টুকরোটি… সেই গানটিই হল মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য। ... আমার ধারণা, আমার পাঠক-পাঠিকাদের এসব জানা; তবু না-জানা থাকলে বলবেন… মন্তব্যের আকারে জানিয়ে দেব। কত ধরনের গান করেছেন, ভাবা যায় না! রবীন্দ্রসংগীত, গজল, ভজন কী করেননি? ইউটিউবে গিয়ে ‘মাতৃবন্দনা' বলে ভক্তিমূলক গানের একটা অ্যালবাম শুনে নিতে পারেন; মন ভরে যাবে। 

এ বার উপসংহার টানতে চাই এই শ্রদ্ধার্ঘ্যের, যদিও অনেক গান বা অনেক অনুভূতির কথাই বলা বাকি রয়ে গেল!! দিন যায়, মাস যায়, বছর গড়ায়… বাঙালির কাছে দুর্গাপুজার আবেদন কিন্তু একই রয়ে গিয়েছে। মহালয়ার ভোরে আকাশবাণীর মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান, আমাদের মনেপ্রাণে একই আবেদন নিয়ে আসতে থাকে, সে যতই পুরনো এই অনুষ্ঠান হোক না কেন !!! সেই আধো ঘুম আর আধো জাগরণে শোনা মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে, 'তব অচিন্ত্য রূপ-চরিত-মহিমা' !!  গানের প্রথম শব্দ শুরু হওয়ার আগে সেই অবিস্মরণীয় কণ্ঠে যখন… ও... ও... ও ... এই টানটা কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, তৎক্ষণাৎ যেন চেতনার উন্মেষ ঘটত… বাইরে তখন পাখিরা কিচিরমিচির শুরু করে দিয়েছে … সুয্যিমামা ওয়ার্ম আপ শুরু করছেন সারাদিনের ডিউটি শুরু করবার আগে… এই গান অন্তরে যেন আলতো করে পরশ করে জানিয়ে দেয় যে মা আসছেন এই ধরাধামে !! এক অনির্বচনীয় শিহরন জাগে আট থেকে আশি, সব বয়সের মানুষের মধ্যে। তিনি নেই আমাদের মধ্যে, কিন্তু তাঁর গান !! কারসাধ্য মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গান আমাদের মন থেকে মুছে দেয়? ♥♥

আ মরি বাংলা-র আরও খবর পড়তে ক্লিক করুন: www.amar-ebangla.com


(যাঁদের সাহায্য না পেলে এই লেখা তৈরি করা হয়তো হতো না, তাঁরা হলেন সর্বশ্রী শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, রূপায়ণ ভট্টাচার্য, সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।)  

ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক করুন আ-মরি বাংলা-র ফেসবুক পেজ , ফলো করুন আমাদের টুইটার-এ।