শিলাই থেকে শিলাবতী, কন্যা থেকে দেবী

জয়পণ্ডা ও শিলাবতী নামে দুটি চরিত্রকে অবলম্বন করে আজও পুঞ্চা ব্লক সহ মানভূমের গ্রামগঞ্জে প্রচলিত আছে একটি লোককাহিনি। জয়পণ্ডা ও শিলাবতী আসলে দু'টি নদীর নাম। পুঞ্চা থানার বড়গ্রাম মৌজায় আজও গ্রামবাসীদের মুখে শোনা যায় শিলাবতীর অমর সেই কাহিনি।

শিলাই থেকে শিলাবতী, কন্যা থেকে দেবী
উৎস থেকে নির্গত জলরাশি দিয়ে সৃষ্ট জলাশয়। এখান থেকে নালার আকারে শিলাবতী প্রবাহিত হয়েছে

শিলাবতীকে দেখেই তাঁর পায়ে পড়ে প্রণাম করতে যান জয়পণ্ডা। শিলাবতী লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। অমনি জলপূর্ণ মাটির কলসি কাঁখ থেকে পড়ে যায়। সেই জল সরু স্রোতের আকারে বইতে লাগল। সেই স্রোত ধরে শিলাবতীও ছুটতে লাগলেন। কিন্তু যতই শিলাবতী ছোটেন, স্রোত তত গভীর হয়। শিলাবতীর গল্প শোনাচ্ছেন কল্যাণ কুণ্ড‌ু

শিলাবতীর গল্প...

কাঁসাই আর শিলাই। মানভূম তথা পুরুলিয়ার দুই কন্যা। বড় আদরের। একজন নেমে এসেছে জেলার উত্তর পশ্চিমে ঝালদার জাবর পাহাড় থেকে। আর একজন জন্মেছে জেলার দক্ষিণ পশ্চিমের পুঞ্চা থানার বড়গ্রামের বন অধ্যুষিত মালভূমিতে। দু'টি নদীকে ঘিরে মানভূমের আবেগের অন্ত নেই। কবিতায়, গল্পে, ঝুমুর গানে, টুসু গানে আদরিনী কন্যাদের নিয়ে গড়ে উঠেছে মানভূমের সাহিত্য সম্ভার। এই প্রতিবেদনটি মূলত শিলাই (Shilai) বা শিলাবতী (Shilavati)-কে নিয়ে। কন্যা থেকে দেবকন্যায় পরিণত হওয়া মানভূমের এক লৌকিক দেবী (The story of Shilabati)।

শিলাবতীর উৎস ও প্রবাহ নিয়ে ভৌগোলিক ব্যাখ্যা কম-বেশি সকলেরই জানা। ভূগর্ভস্থ ভৌম জলরাশি নির্গত হয়ে আসছে রুক্ষ এক পাথুরে গর্ত থেকে! সম্ভবত এটি একটি আর্টেজীয় কূপ। গ্রীষ্মে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ে। পাশের নিচু অগভীর জমিতে গড়ে উঠেছে একটি পুকুর বা জলাশয়। পুকুরটি থেকে ঘাস গুল্মে ঢাকা সরু একটি নালা বের হয়ে বয়ে গেছে ক্রমশ দক্ষিণ পূর্বাভিমুখী। প্রশ্ন জাগতেই পারে, কোথায় নদীর জন্মমুহূর্তের সেই উচ্ছ্বলতা? বর্ষা ছাড়া সারা বছরই ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তেই থাকে। আর বইতে থাকে অন্তঃসলিলা ধারা। অগভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বইতে বইতে পৌঁছে গিয়েছে পাশ্ববর্তী বাঁকুড়া জেলায় তারপর পশ্চিম মেদিনীপুরে। উৎস থেকে যত দূরে গিয়েছে, ধীরে ধীরে নদীটি পেয়েছে তাঁর প্রবাহিনী রূপ। অসমতল রাঢ় মালভূমি পেরিয়ে সমতলে এসে ঘাটালে দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পরবর্তীতে রূপনারায়ণ নামে অবশেষে হুগলি নদীতে যোগ দিয়ে চলেছে সাগর সঙ্গমে।

শিলাবতীর উৎস মুখ...

এই প্রতিবেদনে নদীর গতিপথ নিয়ে বিশেষ কোনও আগ্রহ নেই। যে বিষয়টিতে মূল আকর্ষণ, তা হল শিলাবতীকে ঘিরে মানভূমে প্রচলিত লোককথা। নদী মাতৃক বাংলায় নদীর ‘মা’ হয়ে ওঠার লোকবিশ্বাস। যে বিশ্বাস থেকে আদরের কন্যার দেবীত্বে উত্তরণ। শিলাই নদীর উৎসস্থলে গড়ে উঠেছে দেবী শিলাবতীর মন্দির। নিত্যপুজা সহ বছরের মকর সংক্রান্তিতে মেলার আয়োজন। দেবীর কাছে জেলার অধিবাসীদের প্রার্থনা, মনস্কামনা পূরণ মনে করিয়ে দেয়– মানুষই দেবতা গড়ে, তাহারই কৃপার পরে, করে দেব মহিমা নির্ভর।

ইদানীং একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। লেখকের অভাব নেই। অভাব নেই তথ্য বিকৃতির। তাই, প্রচলিত লোককথার সঙ্গে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নতুন নতুন ডাইমেনশন নিয়ে আসছেন। সৃষ্টি করছেন নতুন লোককথা। আদি ও অকৃত্রিম গল্পগাঁথার বিকৃত রূপ জন মনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। সেই গল্পে জয়পন্ডা কখনও শিলাবতীর প্রেমিক, কখনও পালক পিতৃস্থানীয় ঋষি। আবার কখনও পুরন্দর শিলাবতীর স্বামী। কখনও-বা দ্বারকেশ্বরকে স্বামীত্বের আসন প্রদান করছে।

যা-ই হোক, লোককথা যেহেতু লোকমুখ প্রচলিত কথা, তাই অধিক প্রচলিত কাহিনিটাই জানার চেষ্টা করা যাক। তথ্য প্রমাণ কী আছে, ততটা গভীরতায় ঢুকতে পারিনি। তবে, শোনা কাহিনিগুলোর মধ্যে যেটা অধিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে, আসুন সেই কাহিনি শুনি।

মন্দিরে দেবী শিলাবতীর মূর্তি ও জয়পণ্ডা...

জয়পন্ডা ও শিলাবতী নামে দু'টি চরিত্রকে অবলম্বন করে আজও পুঞ্চা ব্লক সহ মানভূমের গ্রামগঞ্জে প্রচলিত আছে একটি লোককাহিনি। জয়পণ্ডা ও শিলাবতী আসলে দু'টি নদীর নাম। পুঞ্চা থানার বড়গ্রাম মৌজায় আজও গ্রামবাসীদের মুখে শোনা যায় শিলাবতীর অমর সেই কাহিনি।

অতীতের মানভূম ছিল বন-জঙ্গলে ভরা। বিভিন্ন মুনি-ঋষির আশ্রম ও তপোবন ছিল সারা বনাঞ্চল জুড়ে। জয়পণ্ডা ছিলেন এক সিদ্ধ ঋষি। বড়গ্রামের এক নির্জন শাল-পলাশের  জঙ্গলে  বসবাস করতেন। বিদ্যাচর্চা, ধ্যান, জপতপ ও কিছু ছাত্রকে বৈদিক শিক্ষা দান করা ছিল তাঁর নৈমিত্তিক কাজ। শিলাবতী ছিলেন একজন ভূমিকন্যা এবং এই জয়পণ্ডার তপোবনের আশ্রমে আশ্রিতা। শিলাবতীর ছিল আশ্রম কুটিরের কাজ, জল নিয়ে আসা, ফুল তোলা, পুজোর জোগাড়, আল্পনা দেওয়া, ঘরকন্নার কাজ। বেশ কিছু ছাত্র জয়পণ্ডা ঋষির কাছে আসতো বেদ উপনিষদ পাঠ নিতে। তাঁদের সঙ্গে ঋষির কাছে পাঠ নিতেন শিলাবতী।

একবার এক পৌষের শীতে মকরসংক্রান্তি উপলক্ষে জয়পণ্ডা মনস্থ করলেন আশ্রমের ছাত্রদের নিয়ে গঙ্গাস্নানে যাবেন। শিলাবতীও সব শুনলেন, ইচ্ছে প্রকাশ করলেন, -- গুরুদেব, আমিও আপনাদের সঙ্গে যাব গঙ্গাস্নানে। বেশ কিছুক্ষণ ভাবলেন ঋষি। তারপর বললেন,-- মা গো, সে তো বহুদূর, তা ছাড়া তুমি সমত্ত যুবতী। পথে চোর ডাকাতের বড় ভয় ... কখন কী অঘটন ঘটে যায়? তার চাইতে তুমি এখানেই থাকো। কিন্তু শিলাবতী, ঋষির সঙ্গে যাবেনই। অনশন শুরু করেন। সে সময় রাঢ় অঞ্চলের জঙ্গল ছিল শ্বাপদ-সংকুল। দস্যুরাও জঙ্গল দাপিয়ে বেড়াত। জয়পাণ্ডা ঋষি অপারগতার জন্য দুঃখিত হলেন।  কোনও ভাবেই শিলাবতীকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। 

মকরসংক্রান্তির তিন দিন আগে পাঁচ জন শিষ্যকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন স্নানযাত্রার উদ্দেশে। যাবার মুহূর্তে শিলাবতী কাঁদতে কাঁদতে ঋষির পায়ে পড়ে বললেন,-- গুরুদেব আপনি তো আমায় নিয়ে যাবেন না, এই পুঁটুলিটা আপনি আমার হয়ে মা গঙ্গাকে উৎসর্গ করে দেবেন।  শিলাবতীর দেওয়া একটা কাপড়ের পুঁটুলি ও তাঁর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ঋষি। 

শিলাবতী মন্দির...

এতটা পথ চলতে চলতে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। অপর দিকে শীতের বিকালে রাঢ় জঙ্গলে দ্রুতই আঁধার নামল। ঘন জঙ্গলের মাঝে শিষ্যদের নিয়ে রাত কাটাবার মনস্থ করলেন ঋষি। মাঝরাতে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন এমন এক সময় একদল ডাকাত তীর্থযাত্রীর দলকে আক্রমণ করল। শিলাবতীর দেওয়া সেই পুঁটুলি বুকে চেপে ধরে জয়পণ্ডা ঋষি বারবার মা গঙ্গার নাম উচ্চারণ করতে থাকেন। ডাকাতের দল তীর্থযাত্রী ঋষি ও তাঁর  শিষ্যদের কোনও রকম ক্ষতি বা হেনস্তা না করেই চলে গেল। 

পরদিন আবার সবাই বেরিয়ে পড়ল, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় হয়। হঠাৎ তাদের সামনে হাজির হল এক ভয়ংকর চিতা বাঘ। ঋষি  ভাবলেন এবার বুঝি রক্ষা নেই। তিনি ভয়ে সেই পুঁটুলিকে বুকে জড়িয়ে মা গঙ্গার নাম জপ করতে থাকলেন। বাঘ গুটিগুটি পায়ে চলে গেলে।

জলাশয়টি সূর্যাস্তের সময়...

অবশেষে পরদিন ভোরবেলায়  তাঁরা হাজির হলেন গঙ্গার ঘাটে। জয়পণ্ডা ও তাঁর শিষ্যগণ গঙ্গাস্তোত্র জপ করতে করতে পরম আনন্দে গঙ্গায় অবগাহন করলেন। তারপর, শিলাবতীর দেওয়া সেই পুঁটুলিটা গঙ্গার বুকে ভাসিয়ে দিলেন জয়পন্ডা ঋষি। অবাক হওয়া তখনও বাকি। দেখলেন শ্বেত শুভ্র দুই হাত নদীবক্ষ থেকে উঠে এসে পুঁটুলিটা নিয়ে আবার জলে নিমজ্জিত হল। এই দৃশ্য দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়লেন জয়পণ্ডা। দু'চোখে ঝরতে লাগল আনন্দাশ্রু। বারংবার একই প্রশ্ন মনে জাগল। কে? কে এই শিলাবতী? তিনি শিষ্যদের নিয়ে আশ্রম অভিমুখে রওনা হলেন। পথিমধ্যে তাঁর বারংবার মনে পড়ল শিলাবতীর কথা। তিনি বুঝতে পারলেন সেই পুঁটুলিই তাঁকে ঘোর বিপদ থেকে বারবার রক্ষা করেছে। কিন্তু কী এমন বস্তু ছিল সেই পুঁটুলিতে যা মা গঙ্গা স্বয়ং দু’হাত দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন? 

শিলাবতীকে  দেখার জন্য ঋষির মন ছটফট করতে লাগল। বুঝতে অসুবিধা হল না, শিলাবতী কোনও সাধারণ কন্যা নন। তিনি ঠিক করলেন আশ্রমে ফিরেই সেই অসাধারণ কন্যার পায়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা চাইবেন। তিনি মৌন হয়ে দ্রুত পথ চলতে থাকেন। 

ALSO READ। কৃষ্ণপ্রেম প্রত্যাখ্যানে সাগরের পথ হারায় কংসাবতী

আশ্রমে পৌঁছে ঋষি জয়পণ্ডা উচ্চস্বরে ডাকলেন,-- শিলাবতী, মা শিলাবতী। শিলাবতী তখন পুকুর থেকে বড় মাটির কলসিতে জল নিয়ে আসছিলেন। ডাক শুনে শিলাবতী উপস্থিত হলেন ঋষির সন্মুখে। শিলাবতীকে দেখেই তাঁর পায়ে পড়ে প্রণাম করতে যান জয়পণ্ডা। শিলাবতী লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। অমনি জলপূর্ণ মাটির কলসি কাঁখ থেকে পড়ে যায়। সেই জল সরু স্রোতের আকারে বইতে লাগল। সেই স্রোত ধরে শিলাবতীও ছুটতে লাগলেন। কিন্তু যতই শিলাবতী ছোটেন, স্রোত তত গভীর হয়। শিলাবতীকে লক্ষ্য করে তাঁর পিছুপিছু ঋষিও ছোটেন। কিন্তু শিলাবতী কিছুতেই ঋষিকে পা স্পর্শ করতে দেবেন না। শিলাবতী ছুটতে ছুটতে এক সময় হারিয়ে গেলেন সেই জলধারায়। জয়পণ্ডা সেই জলধারাকে লক্ষ্য করে ছুটতে ছুটতে এক সময় বুঝতে পারেন এ ভাবে তাকে ধরা যাবে না। তাই কমণ্ডলু থেকে মন্ত্রপুত জল নিয়ে জলধারা সৃষ্টি করেন। তারপর  শিলাবতীর উদ্দেশে ধাবিত হলেন। অবশেষে মেদিনীপুরের কাছে একত্রিত হলেন গুরু-শিষ্যা। তৈরি হল মহাস্রোত। ধাবিত হল গঙ্গার উদ্দেশে।

ALSO READ। নিভৃত নির্জনের অপ্সরী, ঘাঘেশ্বরী

পুঞ্চা থানার বড়গ্রামে শিলাবতীর উৎসস্থলে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মা শিলাবতী মন্দির। সেখানে দেবীমূর্তির কোলে দেখা যাবে সেই কলস। মন্দিরের দেওয়ালে  শিল্পীর তুলিতে আঁকা রয়েছে জয়পণ্ডা ঋষির কাহিনি। এখানে দেবীর নিত্যপুজো হয়। পৌষ সংক্রান্তিতে বসে বিশাল মেলা। আদরের কন্যাকে দেবীরূপে বরণ করেছে মানভূম।

ALSO READ। অচেনা পুরুলিয়া— নকশা গ্রাম

আ-মরি বাংলা-র সব খবরের নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক করুন ফেসবুক পেজ ও ফলো করুন টুইটার