সাত গুড়ুম সাত গুড়ুম তোমার কাছে যাব!

মিষ্টি খেতে ভালো। স্বাদ মিষ্টি। কিন্তু অক্ষর দিয়ে তা বোঝানো কার সাধ্য! সাত গুড়ুম নদীর বন্য সৌন্দর্য দু'চোখে অনুভব করতে হলে সেখানে যেতে হবে। লিখে বোঝানো অসম্ভব।

সাত গুড়ুম সাত গুড়ুম তোমার কাছে যাব!
নদী আপন বেগে... বর্ষায় সাত গুড়ুম

হরেক কিসিমে’র হরিয়ালি আর ঘন জঙ্গল ঘেরা অফবিট ভ্রমণের ডেসটিনেশন দুয়ারসিনির পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীটিকে একবার দেখলে নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, মুখ ফেরাতে পারবেন না। সাত গুড়ুমের বন্য আবিল রূপ আপনাকে ফিরে ফিরে ডাকবে। এ নদীর বন্য সৌন্দর্য অক্ষর দিয়ে বোঝানো কার সাধ্য! লিখছেন কল্যাণ কুণ্ড‌ু

ধরুন, আগে কোনও দিন 'সাত গুড়ুম' নামটাই শোনেননি, চোখে দেখা তো দূর। নামটা যেন কেমন কেমন! এ আসলে কী বস্তু? যখন জানলেন, সাত গুড়ুম  সুবর্ণরেখার (Subarnarekha) একটা উপনদী। 'উপ' শব্দটা শুনে অজান্তেই মুখ দিয়ে একটা অবজ্ঞা সূচক শব্দ বের হয়ে এল, 'অ'।

না, সত্যি সত্যি অবজ্ঞা করলেন, এ কথা বলছি না। ওই যে বললাম ধরে নিন, এরকম একটা ফিলিংস আপনার  হল। হতেই পারে। কোথায় গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, দানিউব বা ভল্গা! নীল নদ কিংবা অ্যামাজন হলেও কথা ছিল। আমার দিকে সরাসরি আঙুল তুলে বলতেই পারেন,-- তোমার কি কোনও কাজ নেই। সাত গুড়ুম (Sat Gurum) নিয়ে পড়েছ? রসিয়ে রসিয়ে কাব্য করছ,-- 'সাত গুড়ুম সাত গুড়ুম তোমার কাছে যাব!'

ধরেই নিয়েছি তো, সাত গুড়ুম আপনার আমার না দেখা। না দেখা হওয়ায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ 'ইয়ারো আনভিজিটেড' কবিতার মতো বলেতেই পারি,--

" What's Yarrow but a river bare
That glides the dark hill under?
There are a thousand such elsewhere
As worthy of your wonder."

ঠিকই তো, সাত গুড়ুমও একটা উপনদী মাত্র। কোনও ইয়ারো নয়, স্কটল্যান্ডের মতো নয়নাভিরাম দেশে বয়ে যায়নি। সাত গুড়ুমের চেয়ে হাজারো বড় বড় নদী আছে যা আপনাকে যুগপৎ বিস্মিত ও পুলকিত করতে পারে।  মাত্র ৩০/৩৫ কিলোমিটারের একটা উপনদীকে নিয়ে এত্তো আদিখ্যেতার কী প্রয়োজন? 

ALSO READ। কৃষ্ণপ্রেম প্রত্যাখ্যানে সাগরের পথ হারায় কংসাবতী

শরত্‍‌ সুন্দরী: সাত গুড়ুম অন্য রূপে

তা হলে বলি। পুরুলিয়ার (Purulia) আন্দামান (দুর্গমতার কারণে) নামে খ্যাত বান্দোয়ান ব্লকের দুয়ারসিনি পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে ঝাড়খণ্ডে ঢুকে সুবর্ণরেখা নদীতে পড়েছে সাত গুড়ুম। দুয়ারসিনি (Duarsini) বলাতে হয়তো আপনার মনে কিছুটা সম্ভ্রম জাগতে পারে। দুয়ারসিনি (Duarsini) ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে লোভনীয় প্রকৃতি বিনোদনের জায়গা। পাহাড়ের কথা বলতেই দলমা রেঞ্জের রাইকা, আসনপানির নাম শুনে আরও একটু নড়েচড়ে বসলেও বসতে পারেন।

ALSO READ। অচেনা পুরুলিয়া— নকশা গ্রাম

এতক্ষণে হয়তো আপনার মনে কিছুটা আগ্রহ জেগেছে, মনে হয়। হরেক কিসিমে’র হরিয়ালি আর ঘন জঙ্গল ঘেরা অফবিট ভ্রমণের ডেসটিনেশন দুয়ারসিনির পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীটিকে একবার দেখলে নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, মুখ ফেরাতে পারবেন না। আদিম রহস্য, ঘন জঙ্গল, আলো আঁধার আর বন্য রোমাঞ্চের আকর, সাত গুড়ুমের সঙ্গে যখন মুখোমুখি হবেন ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো আপনাকেও বলতে হবে, 

"And is this -- Yarrow? This stream 
Of which my fancy cherished, 
So faithfully,  a waking dream?

ইয়ারো শব্দটির বদলে প্রতিস্থাপন করে নিন 'সাত গুড়ুম'।

নদীগর্ভ...

আসুন, সাত গুড়ুম (Sat Gurum) নামটার সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করি। খুব সহজ ও স্থানীয় লোকেদের মুখে মুখে ফেরে যে কথা সেটাই আগে জানি। নদীটি তাঁর গতিপথে জঙ্গলবেষ্টিত বিভিন্ন পাহাড়কে সাত বার পাক দিয়ে বয়ে গেছে এবং বয়ে যাওয়ার সময় পাহাড়ের পাথরে ধাক্কা খেয়ে গুমগুম শব্দ উৎপন্ন করে বলে নামকরণ করা হয়েছে সাত গুড়ুম। 

আর একটা ব্যাখ্যা শুনতে পাই। হয়তো এটাই প্রকৃত কিন্তু সেই জোরালো স্বরে বলা হয় না। সংখ্যাধিক্যের জোরে তাঁদের সংস্কৃতি, সংস্কার এমনকী দেবদেবীকেও কব্জা করে নেওয়ার চল চলছে দেশজুড়ে। প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেবী দুয়ারসিনি। তাঁর মন্দিরের গায়ে চিত্রিত হিন্দু দেবাদিদেব ও দেবী সিংহবাহিনী। অথচ মা দুয়ারসিনি আদিবাসী সমাজের এক লৌকিক দেবী। এ বিষয়ে বিস্তারিত অন্য কোনও লেখায় বলব।

ALSO READ। শিলাই থেকে শিলাবতী, কন্যা থেকে দেবী

যা-ই হোক, ব্যাখ্যাটি হল, সাত গুড়ুম নদী সাতটি জোড়ের সমন্বয়ে উৎপন্ন হয়েছে। সাঁওতাল অভিধানে 'গড়ম'  অর্থ নাতি। চান্দো বোঙ্গার সৃষ্ট পিলচু হড়ম ও পিলচু বুড়ির সাত পুত্রের প্রতীক এই এক একটি জোড়। তার থেকে  সাত গুড়ুম  নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না, এই অঞ্চলের আদিবাসিন্দা সাঁওতাল,  মুন্ডা, খেরোয়ালরা। তাঁদের  প্রদত্ত নাম থেকে নদীটির সাত গুড়ুম নাম হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সাত গুড়ুম প্রকৃত অর্থে নদী হিসেবে উৎপন্ন হয়নি। জোড় বোঝেন, জোড়? নালার চেয়ে একটু বড় স্রোত যা জমির ঢালের সঙ্গে উঁচু থেকে নীচের দিকে প্রবাহমান সরু জলধারা। ছোটনাগপুর মালভূমির এই অংশে, কাটা পাহাড়ের দক্ষিণ ঢাল, পাটকিতা, কড়পা, ডাঙরজুড়ি, কুঁচিয়া, শালডি, মিরগিচামি ও জামজোড়ার বিস্তীর্ণ  ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় বর্ষার জল প্রথমে নালার আকারে, তারপর নালা থেকে জোড় এবং একাধিক জোড়ের জলরাশি পরস্পর মিলিত হয়ে কুচিয়া সিআরপিএফ ক্যাম্পের অদূরে নদীর চেহারা নিয়েছে। তার পর বান্দোয়ান-দুয়ারসিনি সড়কপথের সমান্তরালে বইতে বইতে মা দুয়ারসিনি মন্দিরের বাঁ-পাশ দিয়ে ক্রমাগত দক্ষিণ  অভিমুখে বয়ে চলেছে। নদীর গতিপথে কালো পাথরের ক্ষয়জাত পাহাড়। এ বাঁক, সে বাঁক ঘুরে বনের নিরিবিলি  নদীগর্ভে জায়গায় জায়গায় দেখতে পাবেন অসংখ্য কালো কালো পাথর। বোল্ডার। বর্ষায় পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ার এক রূপ, ভয়াবহ তাঁর স্রোত। অন্যান্য ঋতুতে জঙ্গলবেষ্টিত গতিপথে শান্ত স্বচ্ছ অথচ ক্ষীণ প্রবাহ সাত গুড়ুমকে দৃষ্টিনন্দিত করে তোলে। জল, জমিন, জঙ্গল ও পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে প্রবাহিত হয়ে ঝাড়খণ্ডের দলদলি, লুকাইকানালি, ঘুতিয়া হয়ে নারাঙ্গা ও খুন্তাডির কাছে সুবর্ণরেখায় মিশেছে।

ALSO READ। নিভৃত নির্জনের অপ্সরী, ঘাঘেশ্বরী

স্রোতহীন শীতে...

দুয়ারসিনি মন্দিরের কাছে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে সাদা চুনা পাথর নদীর মাঝ বরাবর এপাশ থেকে ওপাশ, দেখে মনে হবে কেউ যেন নদীটিতে বাঁধ দিতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে লোককথাও আছে। স্বয়ং মা দুয়ারসিনি তাঁর  কিছু আদিবাসী সাঁওতাল শিষ্যদের এই বাঁধ  নির্মাণে আদেশ দেন। তাঁর নির্দেশ ছিল একরাতের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করতে হবে। পূর্ণিমার রাতে চলছিল কাজ। হঠাৎ একটি বনমোরগ ডেকে ওঠে। নির্মাণকারীরা ভাবে ভোর হয়ে এসেছে। তাঁরা কাজ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ভোর হতে তখনও অনেক বাকি ছিল। সব শুনে মা দুয়ারসিনি রেগে যান। বনমোরগের গলা মুচড়ে হত্যা করেন। বনমোরগের মৃতদেহ পাষাণ হয়ে যায়। বাঁধ ওই অবস্থায় রয়ে যায়। আর বাঁধানো হয়নি।

ধীরে ধীরে ধীরে বও: ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত

মিষ্টি খেতে ভালো। স্বাদ মিষ্টি। কিন্তু অক্ষর দিয়ে তা বোঝানো কার সাধ্য! সাত গুড়ুম নদীর বন্য সৌন্দর্য দু'চোখে অনুভব করতে হলে সেখানে যেতে হবে। লিখে বোঝানো অসম্ভব। পাহাড়-নদী-বন, এই তিনের সংমিশ্রণ আর দূষণমুক্ত সুনীল আকাশ আপনার যদি একবার অবলোকনের সুযোগ হয়,  তা হলে 'ইয়ারো রিভিজিটেড'-এর মতো আবার আসতেই পারেন সাত গুড়ুমের কাছে। এলে লাভই আছে। কাছাকাছি গালুডি, ঘাটশিলার আরণ্যক ভূপ্রকৃতি এবং অবশ্যই বৃক্ষনাথ, সাহিত্যিক কমল চক্রবর্তীর ভালপাহাড় দেখা হয়ে যাবে। একটি মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় তিন লক্ষ বৃক্ষ রোপন করে কীভাবে একটা আস্ত বনসৃজন করেছেন, নিজের চোখে দেখে যাওয়া ভালো। তা ছাড়া সাত গুড়ুমকে যদি বর্ষায় দেখেন, তা হলে আবার আসুন পলাশ ফোটার কালে। তখন সাত গুড়ুমের চারপাশ লালে লাল। কাচ জল লালের হোরি খেলে। সাত গুড়ুমের বন্য আবিল রূপ একবার যদি দেখে ফেলেছেন, বার বার মনে হবে-- সাত গুড়ুম, সাত গুড়ুম তোমার কাছে যাব।

ছবি সৌজন্যে গুগল

ALSO READ। Usuldungri: সূর্যোদয়ের সঙ্গে ভাগ্যোদয়ের সন্ধানে উশুলডুংরি

আ-মরি বাংলা-র সব খবরের নিয়মিত আপডেট পেতে লাইক করুন ফেসবুক পেজ ও ফলো করুন টুইটার