করোনায় দ্বিতীয় বার ওরা অভিভাবকহীন, গ্রাম্যবধূ কাবেরীই এখন আগলে রেখেছেন ৬০ অনাথ শিশুকে

শৈশব যাদের চুরি গেছে, তাদের নাম আর পাঁচটা শিশুর মতোই। মৌসুমী, রামলাল কিংবা ফ্যান্সি। তাদের বুকে আগলে রেখেছেন রামপুরহাটের কাছে কুসুম্বা গ্রামের গৃহবধূ কাবেরী মাল।

করোনায় দ্বিতীয় বার ওরা অভিভাবকহীন, গ্রাম্যবধূ কাবেরীই এখন আগলে রেখেছেন ৬০ অনাথ শিশুকে

।। রাহুল হাজরা

রামপুরহাট: মৌসুমী টুডুর বয়স মেরেকেটে ছয় হবে। বাড়ি ছিল নলহাটির বোধরা গ্রামে। ছোট বোন ফ্যান্সি আরও ছোট। জমিতে কাজ করার সময় একই দিনে মা-বাবা দু'জনেই বজ্রপাতে মারা যায়। সেদিনই অনাথ হল দুই বোন। পরিবারে আর কেউ ছিল না, যারা এই একরত্তি শিশু দুটোকে দেখবে। গ্রামের লোকজন দুই বোনকে পৌঁছে দিয়ে গেল রামপুরহাটের অদূরে কুসুম্বা গ্রামের এক অনাথ আশ্রমে। রামলাল হেমব্রম মৌসুমীর থেকে সামান্যই বড়। এখন সাত হবে। বাবা মারা যায় যক্ষ্মায়। বাড়ি বীরভূম-ঝাড়খণ্ড সীমানার বাঁকুলি জোল গ্রামে। তারও একদিন ঠাই হল রামপুরহাটের আশ্রমে। কারণ, বাবার মৃত্যু পর রামলালেরও কাছের বলতে আর কেউ ছিল না। বীরভূমের কুসুম্বা গ্রামের এই অনাথ আশ্রম এ ভাবেই এখন ৬০ শিশুর স্নেহের নীড়।

এই বাচ্চাগুলোর নাম আর পাঁচটা শিশুর মতো শোনালেও এদের সকলেরই শৈশব চুরি গিয়েছে। একজন অবশ্য সর্বক্ষণ আছেন, তিনি কুসুম্বা গ্রামেরই গৃহবধূ। কাবেরী মাল। তিনিই এই শিশুদের মা, তিনিই বাবা। তিনিই অভিভাবক। তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা-প্রশ্রয়ে অনাথ শিশুরা বড় হচ্ছে। তাদের ভেসে যাওয়া শৈশবে খড়কুটোর মতো কাবেরীকে আঁকড়ে ওরা নিরাপত্তার কোল খুঁজে নেয়।

কাবেরী নিজেও আর্থিক ভাবে সচ্ছল নয়। তবু তিনি ছুটে আসেন স্নেহের টানে, মায়ামাখা মুখগুলো তাঁকে অস্থির করে। না এসে উপায়ই বা কী, রামপুরহাটের কুসুম্বা গ্রামের এই আশ্রমের বাচ্চাগুলোর আর যে কোনও অভিভাবক নেই, তিনি ছাড়া।

অভিভাবক ছিল এই সেদিনও। কিন্তু অদৃষ্টের এমন পরিহাস, তিনিও আর নেই। করোনার প্রাণঘাতী ভাইরাস আশ্রমের বাচ্চাগুলোকে দ্বিতীয় বার অনাথ করেছে তাঁকে কেড়ে নিয়ে। তিনি জিম বর্মন। অনাথ আশ্রমটি মূলত তিনিই দেখভাল করতেন। তিনিই ছিলেন আশ্রম পরিচালক। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে জিম বর্মনের মৃত্যুর পরেই চরম অনটনে নেমে এসেছে মৌসুমী-ফ্যান্সি-রামলালদের জীবনে। একে করোনা অতিমারির প্রকোপ, তার উপর আশ্রম পরিচালকের মৃত্যু, এই যুগপত্‍‌ ধাক্কায় চরম আর্থিক অনটন শুরু হয়। 

জিম বর্মন ও গদাধর বর্মনের উত্‍‌সাহে ২০০৯ সালে রামপুরহাটের প্রত্যন্ত গ্রাম কুসুম্বায় 'বিকাহার ইমানুয়েল আশ্রম'টির সূচনা হয়েছিল। অনাথ শিশুদের কথা ভেবে উত্তর দিনাজপুর থেকে বীরভূমে এসে তাঁরা আশ্রম খুলেছিলেন। বীরভূম ও ঝাড়খণ্ডের অনাথ শিশুদের ঠাঁই হয় এই আশ্রমে। এক-এক করে সদস্য বাড়তে বাড়তে ৬০ জন শিশু।

জিম বর্মন যত দিন ছিলেন, বিভিন্ন সহৃদয় ব্যক্তির অনুদানে বাচ্চাগুলোর কষ্ট ছিল না। অভাব বুঝতে দেননি জিম। কিন্তু এখন এদের জন্য দু-বেলা দু-মুঠো শাক-ভাত জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় কাবেরীকে। বলছিলেন, 'লকডাউনের আগে কুসুম্বার এই আশ্রমকে আর্থিক অনুদান দিতেন গুজরাতের এক ব্যবসায়ী। এমনই দুর্ভাগ্য তিনিও এক বছর হল মারা গেছেন। ওই গুজরাতি পরিবার থেকে এখনও আশ্রমে একটা টাকা আসে। তবে, সেটা খুবই সামান্য। এক একটি শিশুর জন্য মাথাপিছু মাসে বরাদ্দ মাত্র ৫ টাকা। এই দুর্মূল্যের বাজারে অনুদানের এই সামান্য টাকায় কষ্টেসৃষ্টে দু-দিন চললেও ৩০ দিন চালানো সম্ভব নয়।

এই অনাথ আশ্রমটি যেখানে সেই কুসুম্বা গ্রামে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামার বাড়ি। ‘বিকাহার ইমানুয়েল আশ্রম’-এর অনাথ শিশুদের খবর, মুখ্যমন্ত্রী রাখেন কি না, জানা নেই। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে কাবেরীর কাতর আর্জি, 'সরকারি অনুদান দিয়ে অনাথ ছেলেমেয়েগুলোকে বাঁচান। ওরা আধপেটা খেয়ে বেঁচে আছে।'

তারাপীঠ মন্দিরের পুরোহিত সুপ্রকাশ চক্রবর্তী লোকমুখে আশ্রমের এই শিশুদের দুরবস্থার কথা জানতে পেরে নিজেই উদ্যোগী হয়ে সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। তারাপীঠে পুজো দিতে আসা ভুক্তদের তিনি আশ্রমের বাচ্চাদের দুর্দশার কথা আগ বাড়িয়ে বলেন। তা শুনে কেউ কেউ ওই আশ্রমে গিয়ে খাবারও দিয়ে এসেছেন। কেউ দিয়ে এসেছেন আর্থিক সাহায্য। কিন্তু করোনাকালে দীর্ঘদিন তারাপীঠ মন্দির বন্ধ থাকায়, তা-ও আর সম্ভব হয়নি। তাই একপ্রকার আধপেটা খেয়েই দিন কাটছে ওই শিশুদের। 

ALSO READ। আরিয়ান খানকে মাদক-কাণ্ডে গ্রেফতার করল এনসিবি

রবিবার হলে কলকাতার ‘ছন্নছাড়া’ নামে একটি গ্রুপের পক্ষ থেকে এই আশ্রমের শিশুদের জন্য খাবার পাঠানো হয়। ছুটির এই দিনটা 'ছন্নছাড়া'র পথ চেয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকে শিশুরা। তারপীঠ মন্দিরের এই পুরোহিত সুপ্রকাশ চক্রবর্তীর খেদ, 'সামনে পুজো। চারিদিকে সাজোসাজো রব। কিন্তু অনাথ শিশুদের নতুন জামা-কাপড় দূর অস্ত, দু'বেলা খাবার জুটছে না। একরত্তি এই বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সকলকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি।' আমরা কি পারি না আমাদের সাধ্যমতো বন্ধুতার হাত বাড়াতে?  

ALSO READ। ৪ কেন্দ্রের উপনির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করলেন মমতা

সাহায্য পাঠাতে পারেন এই ঠিকানায়:

Vikahar Emmanuel Mission
Rampurhat Branch Missiin
Vill: Kusumba, PS: Rampurhat
Dist: Birbhum 
West Bengal- 731224